আসন্ন জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে দেশের জীবনরক্ষাকারী ওষুধ খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচ হ্রাসে কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করার জোর দাবি জানিয়েছেন ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান। একই সঙ্গে তিনি বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ না দিয়ে করের আওতা (ট্যাক্স নেট) ব্যাপকভাবে বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।
আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে দৈনিক প্রথম আলো আয়োজিত ‘সংকটকালের বাজেট ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিয়ে বিশিষ্ট এই নারী শিল্পোদ্যোক্তা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
গোলটেবিল বৈঠকে সিমিন রহমান দেশের কর কাঠামোর বাস্তব সংকট তুলে ধরে বলেন, "ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানি পর্যায়ে বর্তমানে যে ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) কাটা হয়, তা পরবর্তীতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে কোনো ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠান কখনো ফেরত পায় না। এটি ব্যবসায়িক খাতের জন্য বড় বাধা। তাই আমরা জোরালো প্রস্তাব করছি, এই করের হার কমিয়ে অবিলম্বে ৩ শতাংশে আনা হোক। একইভাবে প্রাতিষ্ঠানিক বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও উৎসে কর (টিডিএস) ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হোক। এতে অভ্যন্তরীণ ব্যবসার ওপর থেকে অবাস্তব ও অযৌক্তিক করের বোঝা অনেকাংশে কমবে।"
আর্থিক খাতের চলমান অস্থিরতা ও সুদূরপ্রসারী সংস্কারকে সময়ের দাবি উল্লেখ করে ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও বলেন, "আর্থিক খাতের সংস্কার নিয়ে মুখে কথা বলা সহজ, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন। বর্তমান সরকার বিগত আমল থেকে যে ধরনের নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকট ও চ্যালেঞ্জ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে, তার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি দেশের সৎ ব্যবসায়ীদের ওপর পড়ছে। আমরা যারা প্রকৃত ব্যবসায়ী সমাজ, তারা প্রতিদিন আর্থিক খাতের নানাবিধ সংকটের কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। এই সংস্কারগুলো করা সহজ কথা নয়, তবে দেশের স্বার্থে আমাদের সঠিক ও কঠোর সংস্কারের দিকেই সাহসের সাথে এগোতে হবে।"
দেশের কর-জিডিপি অনুপাত অত্যন্ত আশঙ্কাজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত এখন মাত্র ৬ শতাংশ, যা যেকোনো মূল্যে ১৫ থেকে ২০ শতাংশে উন্নীত করা উচিত। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের অনুপাত সমান হওয়া দরকার। এ জন্য সনাতনী কর ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় (অটোমেশন) রূপান্তর করতে হবে। পাশাপাশি সারা দেশে সব শিল্পের জন্য একটি সুষম ও অভিন্ন ভ্যাট (মূসক) হার থাকা উচিত; অন্যথায় বাজারে অসাধু কারসাজির সুযোগ থেকে যায়।"
ওষুধ শিল্পের বিশ্ববাজার ধরার লক্ষ্যে এবং সক্ষমতা বাড়াতে অর্থমন্ত্রীর সামনে বেশ কিছু দূরদর্শী সুপারিশ তুলে ধরেন সিমিন রহমান। তিনি তৈরি পোশাক খাতের মতো ওষুধ শিল্পের রপ্তানিকারকদের জন্যও অবিলম্বে ‘বন্ডেড ওয়্যারহাউস’ সুবিধা চালুর তাগিদ দেন। একই সাথে রপ্তানির উদ্দেশ্যে আমদানি করা ওষুধের কাঁচামালের ওপর সব ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (রেগুলেটরি ডিউটি) সম্পূর্ণ শূন্য করার প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, "আমরা চড়া শুল্ক দিয়ে কাঁচামাল আনছি, আবার সেই পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করছি। ফলশ্রুতিতে আমাদের উৎপাদন খরচ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেড়ে যাচ্ছে।" এছাড়া ওষুধের গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) ব্যয়কে সম্পূর্ণ করমুক্ত করার এবং ওষুধের স্যাম্পল ও বিপণনের ওপর এনবিআরের বেঁধে দেওয়া শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ ব্যয়ের সীমা (ক্যাপ) তুলে দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
সবশেষে দেশের বেভারেজ বা পানীয় শিল্পের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত করের হার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সিমিন রহমান বলেন, "বাংলাদেশে এই খাতে মোট করের হার ৫৪ শতাংশ, যেখানে প্রতিবেশী ভারতে ৪০ শতাংশ এবং ভিয়েতনামে মাত্র ২০ শতাংশ। গত তিন বছরে সম্পূরক শুল্ক ও টার্নওভার কর ক্রমাগত বাড়িয়ে এই শিল্পকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।" তিনি পানীয় খাতের ন্যূনতম কর ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে আগের মতো ১ শতাংশে ফিরিয়ে আনার এবং বোতলজাত পানির ওপর থেকে সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় ‘সুগার ট্যাক্স’ বা চিনি-নির্ভর আধুনিক কর কাঠামোর প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, "এই খাতে ফ্ল্যাট সম্পূরক শুল্ক না দিয়ে যে পণ্যে চিনির পরিমাণ বেশি, সেখানে কর বেশি হবে; আর যেখানে কম, সেখানে কর কমবে। এতে নাগরিকেরা স্বাস্থ্যকর পণ্য বেছে নিতে উৎসাহিত হবেন।"