আসন্ন বর্ষা মৌসুমে আবহাওয়া ও জলবায়ু সংক্রান্ত তথ্যের ব্যবহার আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘জাতীয় ক্লাইমেট অ্যাপ্লিকেশন ফোরাম ২০২৬’। বৃহস্পতিবার (২১ মে) ঢাকার শেরাটন হোটেলের বলরুম-২-এ এই ফোরাম অনুষ্ঠিত হয়। এতে পূর্বাভাস প্রদানকারী সংস্থা, কারিগরি বিশেষজ্ঞ, উন্নয়ন সহযোগী এবং বিভিন্ন খাতের অংশীজনরা অংশগ্রহণ করেন। ফোরামের মূল উদ্দেশ্য ছিল সাম্প্রতিক জলবায়ু পরিস্থিতি পর্যালোচনা, ঋতুভিত্তিক পূর্বাভাস তুলে ধরা এবং যৌথ কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে খাতভিত্তিক প্রস্তুতি জোরদার করা।
রাইমসের (RIMES) সহায়তায় ইউকে-বাংলাদেশ হাইড্রোমেটিওরোলজিক্যাল কোলাবোরেশন (UK-Bangladesh Hydrometeorological Collaboration), ‘প্রতিষ্ঠা’ (PROTISTHAA) কনসোর্টিয়াম এবং রাইমস-বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন অংশীদারিত্বে পরিচালিত 'ব্রিজেস' (BRIDGES) প্রকল্পের আওতায় এই ফোরামের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশে বন্যা পূর্বাভাস, সতর্কীকরণ সেবা, আগাম পদক্ষেপ (Anticipatory Action) এবং জলবায়ু তথ্য সেবাকে শক্তিশালী করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
ফোরামের উদ্বোধনী অধিবেশনে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের (BMD) পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম সময়োপযোগী আগাম সতর্কবার্তার গুরুত্বারোপ করে বলেন, “জলবায়ু সংক্রান্ত তথ্য যাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, খাত এবং সাধারণ মানুষের ব্যবহারিক প্রস্তুতির পদক্ষেপে রূপান্তরিত হতে পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য এই ফোরাম একটি চমৎকার মাধ্যম।”
ঢাকাস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশনের ক্লাইমেট অ্যান্ড লাইভলিহুডস অ্যাডভাইজার এবং ডেপুটি টিম লিডার এ বি এম ফিরোজ আহমেদ জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে অংশীদারিত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেন। কেয়ার বাংলাদেশের (CARE Bangladesh) প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর মো. ফুয়াদ-উর-রাব্বি ‘প্রতিষ্ঠা’ প্রকল্পটির পরিচয় করিয়ে দিয়ে প্রোটোকল ও ট্রিগারভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত মানবিক সহায়তা ও আগাম পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দেন।
ফোরামে ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা (Flash Flood) নিয়ে একটি কেস স্টাডি উপস্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনজুর রহমান জানান, রাইমসের সহায়তায় পানি উন্নয়ন বোর্ড বন্যা পরিস্থিতির সময় পূর্বাভাস ও আগাম পদক্ষেপ গ্রহণের প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় বড় ধরনের ক্ষতির আগেই প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কারিগরি সেশনে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বিগত ২০২৫ সালের শীতকালীন মৌসুমের আবহাওয়া পরিস্থিতি, পূর্বাভাসের কার্যকারিতা এবং ২০২৫-২০২৬ সালের চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করেন।
আসন্ন গ্রীষ্মকালীন মৌসুমের ঋতুভিত্তিক জলবায়ু পূর্বাভাস উপস্থাপন করেন আবহাওয়াবিদ ড. মো. বজলুর রশিদ। তিনি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, “আগামী জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার উচ্চ সম্ভাবনা রয়েছে। এর পাশাপাশি কম ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাপদাহ এবং সম্ভাব্য রোগব্যাধির প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা রয়েছে।” এই পূর্বাভাস কৃষি, গবাদিপশু, মৎস্য, পানিসম্পদ ও স্বাস্থ্য খাতে সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় ভূমিকা রাখবে। অপর এক সেশনে আবহাওয়াবিদ এস. এম. কামরুল হাসান ‘এল নিনো পূর্বাভাস ২০২৬’ সংক্রান্ত তথ্যবহুল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এবং বাংলাদেশে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার সঙ্গে এনসো (ENSO)-এর সম্পর্ক বিবেচনা করার আহ্বান জানান।
রাইমসের সিনিয়র প্রোজেক্ট অফিসার মুহাম্মদ তানজিলুর রহমান কৃষকদের জন্য পরিচালিত ‘ফার্মার্স ফার্ম স্কুল’ (Farmer’s FARRM School)-এর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, যেখানে কৃষকরা পূর্বাভাস ব্যবহার করে সফলভাবে কৃষি পরিকল্পনা ও দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস করেছে। এছাড়া রাইমসের ক্লাইমেট সার্ভিস এক্সপার্ট আসিফ উদ্দিন বিন নূর এবং সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. ফখরুল আরেফিনের পরিচালনায় একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ সেশনে অংশগ্রহণকারীরা নিজ নিজ খাতের জন্য সুপারিশমালা তৈরি করেন।
এই ফোরামের অন্যতম প্রধান মাইলফলক ছিল ‘বিএমডি মোবাইল অ্যাপ’-এর বেটা ভার্সন (BMD Mobile App beta version) উন্মোচন। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম এবং বিএলআরআই, রাইমস ও বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যৌথভাবে অ্যাপটি উদ্বোধন করেন, যা সাধারণ মানুষের কাছে আবহাওয়া বার্তা সহজে পৌঁছে দিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
সমাপনী অধিবেশনে রাইমসের সিনিয়র অ্যাগ্রোমেটিওরোলজিক্যাল স্পেশালিস্ট ও ডিএই-এর প্রাক্তন মহাপরিচালক ড. মোঃ আব্দুল মুয়ীদ জলবায়ু পূর্বাভাসকে সরাসরি কৃষি সম্প্রসারণ সেবার সাথে যুক্ত করার তাগিদ দেন, যাতে মাঠপর্যায়ের ব্যবহারকারীরা সময়মতো ব্যবহারিক দিকনির্দেশনা পান।
কারিগরি উপস্থাপনা, কেস স্টাডি ও মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে এই ফোরাম বাংলাদেশে জলবায়ুভিত্তিক পরিকল্পনা, আগাম পদক্ষেপ এবং মানুষকেন্দ্রিক সতর্কতা ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন রাইমসের সিনিয়র মেটিওরোলজিক্যাল অফিসার সৈয়দা সাবরিনা সুলতানা।
আকাশজমিন/ আরআর