আব্দুল কাইয়ুম খান, বিশেষ প্রতিনিধি
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন নিবন্ধন অধিদপ্তরে সাব-রেজিস্ট্রার বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এক বিশাল ‘ঘুষ বাণিজ্য সিন্ডিকেট’। এই বদলি বাণিজ্য থেকে অন্তত শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ও তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) শামসুদ্দিন মাসুমের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অনুসন্ধানের আবেদন জমা পড়লে তা নিয়ে আইন ও প্রশাসন অঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
গত ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেন দুদকে এই লিখিত অভিযোগ জমা দেন। অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র আট মাসে নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে অন্তত ২৮২ জনকে বদলি করা হয়। এই বদলি প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে ছিল টাকার খেলা। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ২০০ জন সাব-রেজিস্ট্রার তাদের পছন্দের ‘লাভজনক’ অফিসে পোস্টিং পেতে জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা করে ঘুষ দিয়েছেন।
আইন মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী, ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেডের অফিসগুলোতে স্ব-স্ব গ্রেডের কর্মকর্তাদের পদায়নের নিয়ম থাকলেও, এই বদলি বাণিজ্যে সেই নিয়ম পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ঘুষের বিনিময়ে নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তাদের উচ্চ গ্রেডের অফিসে পদায়ন করা হয়েছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে যোগদানের আগের দিনই পুনরায় বদলির আদেশ দেওয়ার মতো অদ্ভুত ঘটনাও ঘটেছে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল মোটা অঙ্কের টাকা আদায়। ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেনের অভিযোগ, আইন উপদেষ্টার পিএস শামসুদ্দিন মাসুমের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানেই এই ঘুষ লেনদেন সংঘটিত হয়েছে।
সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়গুলো মূলত জমি রেজিস্ট্রেশন, দলিল লিখন, মিউটেশন ও নামজারির মতো স্পর্শকাতর কাজের কেন্দ্রস্থল। অভিযোগ ও বিভিন্ন সময়ের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব অফিসে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে নিয়মিত টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মতো উচ্চ মূল্যের জমি থাকা এলাকাগুলোতে পোস্টিং পেতে সাব-রেজিস্ট্রারদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলে।
অনিয়মের ধরনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নির্ধারিত সরকারি ফির বাইরে দলিলপ্রতি অতিরিক্ত টাকা আদায়, অফিসের ভেতরে-বাইরে গড়ে ওঠা দালাল সিন্ডিকেট, জমির প্রকৃত মূল্য কমিয়ে রেজিস্ট্রেশন ফি ফাঁকি দেওয়া এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দলিল রেজিস্ট্রির নামে ঘুষ আদায়ের ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে যারা এসব লাভজনক অফিসে পোস্টিং নিয়েছেন, তারা মূলত তাদের বিনিয়োগ করা ঘুষের টাকা সাধারণ মানুষের কাছ থেকেই কয়েক গুণ বেশি তুলে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের পাহাড় যখন বাড়তে শুরু করে, তখন ২০২৫ সালের ১ জুন আইন মন্ত্রণালয় একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি ও পদায়নে কোনো আর্থিক লেনদেনের সুযোগ নেই এবং সংশ্লিষ্টদের প্রতারণামূলক প্রস্তাব থেকে সতর্ক থাকতে বলা হয়। তবে সমালোচকরা বলছেন, এ বিজ্ঞপ্তি ছিল কেবল লোক দেখানো। কারণ ততদিনে শত শত বদলিতে শতকোটি টাকার ঘুষ লেনদেন সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। এরপর নতুন করে আর কোনো বড় ধরনের বদলির আদেশ দেখা যায়নি।
দুদক আইন ২০০৪ অনুযায়ী, যেকোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এলে তা অনুসন্ধানযোগ্য। এছাড়া মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ অনুযায়ী, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে, এখন পর্যন্ত দুদক আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মামলা দায়ের করেছে কি না বা সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত কোনো প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কি না, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। আইনত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।
জমি-সংক্রান্ত সেবা সাধারণ মানুষের জীবনের অন্যতম স্পর্শকাতর বিষয়। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে চলা দাললদের দৌরাত্ম্য, অতিরিক্ত ফি ও হয়রানির অভিযোগের সঙ্গে বদলি বাণিজ্যের মতো নতুন অধ্যায় যুক্ত হওয়ায় মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে বসে যারা এ ধরনের অনিয়ম করেছেন, তাদের বিচার হওয়া জরুরি।
নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে তিনটি প্রধান দাবি উঠেছে: প্রথমত, দুদকের অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুত শেষ করে ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সাব-রেজিস্ট্রার বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক ও অটোমেটেড করতে হবে, যাতে মানুষের হস্তক্ষেপের সুযোগ না থাকে। তৃতীয়ত, প্রতিটি বদলির কারণ ও মানদণ্ড জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে, যাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।
সাবেক আইন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগ বাংলাদেশের বিচার ও প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি বড় অগ্নিপরীক্ষা। দুর্নীতিবাজদের সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন সাধারণ মানুষের বড় প্রত্যাশা।
আকাশজমিন / আরআর