সারা দেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া সংক্রামক ব্যাধি হাম এবং এর বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে শিশুদের মৃত্যুর মিছিল দিন দিন দীর্ঘতর হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সারা দেশে হাম ও হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে আরও ১০টি শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। মৃত এই শিশুদের মধ্যে ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১ জন শিশু এবং বাকি ৯ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন করে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে আরও ১ হাজার ১৩৬ জন শিশু। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হাম বলে শনাক্ত করা হয়েছে ৫৩ জনকে।
মঙ্গলবার (২৬ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষ শাখা থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ নিয়মিত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এই উদ্বেগজনক ও আশঙ্কাজনক তথ্য জানা গেছে। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর এই ভাইরাসের মারাত্মক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, হামের এই ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের কারণে এবং হামের বিভিন্ন জটিল উপসর্গ নিয়ে গত দুই মাসে সারা দেশে সর্বমোট ৫৫৫ জন নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সরকারি এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে শতভাগ নিশ্চিতভাবে হামের কারণে মৃত্যু হয়েছে ৮৮ জন শিশুর। অন্যদিকে, ল্যাব পরীক্ষা না হলেও হামের স্পষ্ট এবং তীব্র উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৪৬৭ জন শিশু।
একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে (যা সুনির্দিষ্ট পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত) চিকিৎসাধীন রয়েছে মোট ৮ হাজার ৭৭২ জন শিশু। এর পাশাপাশি হামের তীব্র লক্ষণ ও উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে এসেছে আরও ৬৬ হাজার ২৩ জন শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জেলাভিত্তিক ও বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই ভয়াবহ সংখ্যাটি দেশের ঢাকা বিভাগেই সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু ঢাকা বিভাগেই হাম ও হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে এখন পর্যন্ত রেকর্ড ২৩৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং এই একই বিভাগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৩৭ হাজার ২২৯ জনে।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শিশুদের জন্য অত্যন্ত ছোঁয়াচে ও মারাত্মক এই ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে টিকাদানের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। সাধারণত সঠিক সময়ে হামের প্রতিষেধক টিকা না নেওয়া এবং পুষ্টিহীনতার কারণে শিশুরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এবং নিউমোনিয়াসহ নানা জটিলতায় তাদের মৃত্যু হচ্ছে। বর্তমান এই সংকটময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশের সবকটি সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বিশেষ নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে, শিশুদের শরীরে হামের কোনো লক্ষণ বা উপসর্গ দেখামাত্রই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সাধারণ অভিভাবকদের বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। দেশজুড়ে চলমান এই স্বাস্থ্য সংকট দ্রুত কাটিয়ে উঠতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।