ইউরোপের দেশ ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে এক বাংলাদেশি যুবককে লিবিয়ায় নিয়ে পাচার ও জিম্মি করে নৃশংস নির্যাতনের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার এক ভয়ঙ্কর চিত্র সামনে এসেছে। লিবিয়ায় পাচার করে অপহরণ ও অমানবিক নির্যাতনের মাধ্যমে ওই যুবকের পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ৬৩ লাখ টাকা আদায়ের ঘটনায় জড়িত আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। একই সঙ্গে জিম্মি দশা থেকে ভুক্তভোগী যুবককে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৬ মে) দুপুরে রাজধানীর পশ্চিম আগারগাঁওয়ে পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর)-এর অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান।
সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই কর্মকর্তা বলেন, ইতালি পাঠানোর সুনির্দিষ্ট প্রলোভন দেখিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রথমে ভুক্তভোগী সোহেলের পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। পরে তাকে দুবাই ও মিশর হয়ে লিবিয়ার ত্রিপলী শহরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানকার অপহরণকারীদের একটি আন্তর্জাতিক চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। লিবিয়ায় নিয়ে তাকে জিম্মি করার পর থেকেই শুরু হয় অমানবিক ও পৈশাচিক নির্যাতন। অপহরণকারীরা ভুক্তভোগীর স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের ভয় দেখাতে এবং দ্রুত টাকা আদায় করতে ইমো অ্যাপে কল করে সরাসরি নির্যাতনের লাইভ দৃশ্য দেখাত এবং নির্যাতনের বিভৎস ভিডিও ক্লিপ পাঠাতো। ভিডিওতে তাকে রক্তাক্ত ও গুরুতর জখম অবস্থায় দেখে পরিবার চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এভাবে ভয়-ভীতি দেখিয়ে ও ব্ল্যাকমেইল করে ধাপে ধাপে আরও বিপুল পরিমাণ টাকা আদায় করা হয়।
অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান ভুক্তভোগীর ওপর হওয়া নৃশংস নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে বলেন, সোহেলকে লিবিয়ার একটি অন্ধকার ঘরে দীর্ঘদিন ধরে অনাহারে ও অর্ধাহারে আটকে রাখা হয়েছিল। তার হাতের নখ থ্যাঁতলে দেওয়া, শরীর ব্লেড দিয়ে নির্মমভাবে কেটে রক্তাক্ত করা এবং বৈদ্যুতিক তার দিয়ে অবিরাম মারধরের মতো রোমহর্ষক ও নৃশংস নির্যাতন চালানো হতো। সব মিলিয়ে বিদেশে পাঠানো, মুক্তিপণ ও ডলার ভাঙানোর নামে পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ৬৩ লাখ টাকা লুটে নেয় এই আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রটি। এই পৈশাচিক ঘটনায় সোহেলের স্ত্রী উর্মি বেগম বাদী হয়ে গত ৬ এপ্রিল তুরাগ থানায় মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ আইনে একটি মামলা করেন। পরবর্তীতে মামলাটির অধিকতর ও নিবিড় তদন্তের দায়িত্ব শুরু করে পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর)।
তদন্তের একপর্যায়ে পিবিআইয়ের একটি চৌকস দল অভিযান চালিয়ে টিটু মীর, রহিমা বেগম ও ইসমাইল দেওয়ানসহ এই মানব পাচার চক্রের দেশীয় কয়েকজন সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ করে মুক্তিপণ আদায়, ব্যাংক হিসাব ব্যবহার এবং বিদেশে থাকা মূলহোতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ধার করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত আরও জানান, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রত্যক্ষ সহায়তায় চক্রটির ব্যবহৃত একাধিক ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
পিবিআইয়ের এই ধারাবাহিক তদন্ত ও সাঁড়াশি অভিযানের তীব্র চাপে লিবিয়ার অপহরণকারীরা শেষ পর্যন্ত কোণঠাসা হয়ে পড়ে। তারা বাধ্য হয়ে সোহেলকে লিবিয়ার একটি অজ্ঞাত স্থানে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সহায়তায় তিনি একটি নিরাপদ আশ্রয়ে যান। পরবর্তীতে পিবিআই, ইউএনওডিসি, লিবিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএমের যৌথ সমন্বয়ে তাকে নিরাপদ হেফাজতে নেওয়া হয়। গত ৩ মে তাকে ত্রিপলীর আইওএম আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয় এবং সর্বশেষ ২৫ মে তাকে সম্পূর্ণ নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনে পিবিআই। আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের বাকি পলাতক সদস্যদের গ্রেপ্তার এবং অবৈধ অর্থপাচারের মূল নেটওয়ার্ক উদঘাটনে পিবিআইয়ের তদন্ত এখনও অব্যাহত রয়েছে।