বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা:
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ (BRTA) বর্তমানে নানামুখী ঘুষ ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে তীব্র অভিযোগ উঠেছে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ অফিস সহায়ক পর্যন্ত বিস্তৃত এক শক্তিশালী অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কাছে রীতিমতো জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ সেবাগ্রহীতারা। বিআরটিএ-এর এই বিশাল অনিয়ম ও অর্থ লুটপাট চক্রের অন্যতম প্রধান হোতা এবং প্রভাবশালী যুবলীগ ক্যাডার হিসেবে পরিচিত ঢাকা মিরপুর-১৩ কার্যালয়ের মোটরযান পরিদর্শক রঞ্জিত হালদার। নিজের পদের চরম অপব্যবহার, সরকারি ক্ষমতার দাপট এবং বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি ও তাঁর পরিবার ইতিমধ্যেই শত কোটি টাকার পাহাড়সম অবৈধ সম্পদের মালিক বনে গেছেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। এই গণবিরোধী অনিয়মের বিষয়টি আমলে নিয়ে দেশের দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক (ACC) ইতিমধ্যেই এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি উচ্চপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছে।
দুদকের দায়িত্বশীল ও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায়, বিআরটিএ-এর মোটরযান পরিদর্শক রঞ্জিত হালদার এবং তাঁর স্ত্রী ঝর্ণা রানী বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে শত কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় এই গভীর অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। তদন্তের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর ও ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে রঞ্জিত হালদারের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিস্তারিত তথ্য ও নথি চেয়ে দুদকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতসহ নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ কালো টাকা তিনি অবৈধভাবে বিনিয়োগ করে রেখেছেন। শুধু তাই নয়, দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, রঞ্জিত হালদার মূলত একটি সম্পূর্ণ ভুয়া ও জাল মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে বিআরটিএ-তে সরকারি চাকরি বাগিয়ে নিয়েছিলেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিটি সরকারি দপ্তরে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় কতজন প্রকৃত ব্যক্তি চাকরি করছেন তার তালিকা তলব করেছে এবং রঞ্জিতের মতো ভুয়া সার্টিফিকেটধারীদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া জোরালোভাবে শুরু করেছে।
মিরপুর-১৩ বিআরটিএ কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার কঠোর শর্তে জানান, গোপালগঞ্জ জেলার স্থায়ী বাসিন্দা ও প্রভাবশালী যুবলীগ ক্যাডার পরিচয় হওয়ায় রঞ্জিত হালদারের বিরুদ্ধে অতীতে ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পেত না। সামান্য বিষয়ে যেকোনো সহকর্মী বা কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রকাশ্যে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতেন তিনি। দলীয় সর্বোচ্চ প্রভাব দেখিয়ে অফিসের ভেতরে সার্বক্ষণিক এক ধরনের ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে রাখতেন এই পরিদর্শক। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো, গত ৫ই আগস্টের দেশের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি রাতারাতি নিজের ভোল পাল্টে এবং একই ধরনের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এখনো মিরপুর কার্যালয়ে বহাল তবিয়তে নিজের আসন টিকিয়ে রেখেছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে দেশজুড়ে চলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালেও রঞ্জিত হালদারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত ও আক্রমণাত্মক। আন্দোলন চলাকালে তিনি অফিসের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রকাশ্যে হুমকি দিতেন এবং শিক্ষার্থীদের পক্ষ নিলে নানা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখাতেন। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এসএম মান্নান কচির সরাসরি নির্দেশে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় ছাত্র-জনতার বিপক্ষে আন্দোলন দমাতে ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালাতে তিনি স্বশরীরে রাজনৈতিক ক্যাডারদের সঙ্গে অংশ নিয়েছিলেন।
বর্তমানে এই বিতর্কিত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিআরটিএ-তে অভিযোগের পাহাড় জমেছে। ঘুষের সুনির্দিষ্ট ও মোটা অঙ্কের টাকা ছাড়া রঞ্জিত হালদারের টেবিলে কোনো ফাইল নড়ে না বলে ভুক্তভোগী ও কর্মচারীরা প্রতিনিয়ত অভিযোগ করছেন। একটি নির্ভরযোগ্য ও বিশেষ সূত্র জানায়, নিজের এই বিপুল অপকর্ম ও অবৈধ লেনদেনের তথ্য ধামাচাপা দিতে তিনি অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে একদল নামধারী সাংবাদিককে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসিক মাসোহারা বা চাঁদাও দিয়ে আসছিলেন। আর এই সুনির্দিষ্ট কারণেই তাঁর এই সীমাহীন ঘুষ ও প্রাতিষ্ঠানিক অপকর্ম নিয়ে অতীতে গণমাধ্যমে কোনো বড় সংবাদ বা প্রতিবেদন সহজে প্রকাশ হতো না। মাঝেমধ্যে দু-একটি সংবাদ প্রকাশ হলেও তিনি অবৈধ অর্থের জোরে রাতারাতি তা ‘ম্যানেজ’ বা ধামাচাপা দিয়ে ফেলতেন।
আসলে বিআরটিএ-তে চলমান প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এখন সমাজের একটি ওপেন সিক্রেট বিষয়। এখানে একটি সাধারণ ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে ৮ থেকে ১৫ হাজার টাকা, ফিটনেস সার্টিফিকেট নবায়নে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা এবং নতুন মোটরযান রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধনের জন্য ৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত সরাসরি ঘুষ দিতে হয়। এছাড়া গণপরিবহনের রুট পারমিট ইস্যু ও তা নবায়নের ক্ষেত্রে লাখ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন হয়। সুসংগঠিত দালাল, অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই ঘুষের টাকা প্রতিদিন ভাগ হয়ে একদম উপর মহল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আর মোটরযান পরিদর্শক রঞ্জিত হালদার দীর্ঘ দিন ধরে এই পচা ও দুর্নীতিগ্রস্ত সিস্টেমেরই অন্যতম শীর্ষ সুবিধাভোগী হিসেবে নিজের আখের গুছিয়ে নিয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের চলমান এই নিবিড় অনুসন্ধান দ্রুত শেষ করে এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবিলম্বে ফৌজদারি মামলা দায়ের এবং কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশায় বুক বাঁধছেন বিআরটিএ-তে এসে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হওয়া হাজার হাজার সাধারণ ভুক্তভোগী নাগরিক।
আকাশজমিন / আরআর