ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

চিরনিদ্রায় শায়িত তোফায়েল আহমেদ: মা-বাবার সান্নিধ্যে ফিরলেন জাতির সূর্যসন্তান


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ০২ জুন, ২০২৬ সময় : ৬:২৩ পিএম

ফাতেমা খানমের খুব আদরের সন্তান ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। জীবনের ব্যস্ততা, রাজনীতির উত্তাল দিন, আন্দোলন-সংগ্রামের কঠিন সময়—সব কিছুর মাঝেও মা ছিলেন পরম নির্ভরতার স্থল, প্রেরণার উৎস। রাজনীতির মঞ্চে যখন তিনি বজ্রকণ্ঠে কথা বলতেন, তখনো তার মনের একটি কোণে সর্বদা জেগে থাকত মায়ের মুখচ্ছবি।

বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের রূপকারদের অন্যতম তোফায়েল আহমেদ মাকে নিয়ে ২০১৮ সালে এক স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, “মা এবং মাতৃভূমি আমাদের কাছে সমার্থক। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষণরত সদস্যদের উদ্দেশে বক্তৃতায় বলতাম, ‘বঙ্গবন্ধু, তুমি কোথায় আছ, কেমন আছ, আমরা জানি না। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা বাংলাদেশকে হানাদারমুক্ত করতে না পারব, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা মায়ের কোলে ফিরে যাব না।’ সেদিনের সেই শপথও আমরা জীবনবাজি রেখে বাস্তবায়ন করে দেশমাতৃকাকে মুক্ত করেছি। যুদ্ধ শেষে বিজয়ীর বেশে আমি ও রাজ্জাক ভাই ১৮ ডিসেম্বর এবং স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের নেতৃবৃন্দ ২২ ডিসেম্বর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করি। আর ২৮ ডিসেম্বর ভোলায় গ্রামের বাড়িতে অবস্থানরত আমার পরম শ্রদ্ধেয় জননীর কোলে ফিরে যাই।”

দ্বীপ জেলা ভোলার সন্তান তোফায়েল আহমেদ জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রস্থলে পৌঁছেও মাতৃস্নেহের কাঙাল থেকেছেন। জেলগেট থেকে শুরু করে মন্ত্রিপাড়া—কোথায় নেই মা। তিনি লিখেছেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বমোট সাতবার আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং প্রত্যেকটি জায়গায় আমার বৃদ্ধা মা ছেলেকে দেখার জন্য ছুটে গিয়েছেন। সে কী কষ্ট! জেলগেটে যখন মা আমার সঙ্গে দেখা করতেন, সর্বক্ষণ আমার মাথাটা মায়ের বুকে থাকত। তারপর যখন তিনি আমাকে রেখে বিদায় নিতেন, তখন তার দুই চোখে অশ্রুর নদী। দুই ছেলে মৃত্যুবরণ করেছে, এক ছেলে কারান্তরালে। কী নিঃস্ব-রিক্ত আমার মা!’

দেশের মন্ত্রী হওয়ার পরেও মায়ের কাছে তোফায়েল আহমেদ ছিলেন আদরের সেই ছোট্ট ‘মনু’। তিনি স্মৃতিকথায় আরও যোগ করেন, “সুখে-দুঃখে মা আমায় ছায়া দিতেন বটবৃক্ষের মতো। ’৯৬-এ সরকার গঠনের পর আমি তখন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী। বেইলি রোডে অবস্থিত বাসভবন ‘তন্ময়’-এ থাকি। মা আমার সঙ্গেই থাকতেন। প্রতিদিন মায়ের আদর নিয়ে তবেই দিনের কাজ শুরু করতাম। বনানীর যে বাসায় এখন থাকি, এই বাসায় আমার শয়নকক্ষের পাশেই মায়ের ঘর। সকালে ঘুম ভাঙার পর মায়ের স্নেহের আলিঙ্গন, আদর ছিল নিত্যদিনের পাথেয়। মাকে চুমু দিয়ে সকালে বের হতাম। আমি না ফেরা পর্যন্ত মা জানালার কাছে হাতে তসবিহ নিয়ে পথের দিকে তাকিয়ে থাকতেন কখন ফিরি। ঘরে প্রবেশ করেই মাকে চুমু দিয়ে রুমে যেতাম।”

মমতাময়ী মাকে হারানোর বেদনা আমৃত্যু বহন করেছেন তোফায়েল আহমেদ। ফাতেমা খানমের কবর-ফলকে হৃদয়ের শ্রদ্ধাঞ্জলি উৎকীর্ণ করে লিখেছিলেন— ‘মা, বাবা চলে গেছেন অনেক আগে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তোমারই পাশে তুমিও চলে গেলে আমাদের সকলকে কাঁদিয়ে, তবু তোমরা আছ সর্বক্ষণ আমাদের হৃদয়জুড়ে। মা, প্রতি মুহূর্ত তোমাদের অভাব অনুভব করি। তোমার মনু (তোফায়েল)’

৮২ বছরের জীবন শেষে আবার মায়ের সান্নিধ্যে ফিরলেন জাতির সূর্যসন্তান। এ যেন দ্বিতীয়বার এবং চিরস্থায়ী ফিরে যাওয়া। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর মাথা উঁচিয়ে জন্মভূমিতে ফিরেছিলেন ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর। এবার ৫৪ বছর ৫ মাস ৫ দিন পর ফাতেমা খানমের কাছে চিরদিনের জন্য ফিরে গেলেন তার আদরের ‘মনু’। অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী মা-বাবার কবরের পাশে চিরশায়িত হলেন বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের অন্যতম রূপকার তোফায়েল আহমেদ।


জীবন সমাপ্তিতে যেন পূর্ণতা পেল হারিয়ে যাওয়া মায়ের কাছে সন্তানের ফিরে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। যে মানুষটি সারা জীবন ভালোবেসেছেন দেশমাতৃকাকে, ইতিহাসকে বুকে ধারণ করেছেন, তিনি শেষ আশ্রয়ও নিলেন শিকড়ের কাছেই—মায়ের পাশে। তোফায়েল আহমেদের মরদেহ মঙ্গলবার ভোলায় নেওয়ার পর হাজার হাজার মানুষ চোখের পানিতে জানায় শেষ বিদায়। দুপুর আড়াইটায় ভোলা সরকারি স্কুল মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘গার্ড অব অনার’। এরপর বিকেল সোয়া ৪টার দিকে ভোলা সদরের দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে মা-বাবা ও স্ত্রীর কবরের পাশে চির শায়িত হন ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতির এই উজ্জ্বল নক্ষত্র।

কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন সময়কে বদলে দিতে। তাদের জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও কীর্তি হয়ে ওঠে দীর্ঘস্থায়ী। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন তেমনই এক ক্ষণজন্মা, কীর্তিমান মানুষ। তার প্রস্থান একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি, তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি এক অমোচনীয় নাম। ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় নেতা হিসেবে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা ছিল ইতিহাসের সাক্ষী। আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা হিসেবে তিনি তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন অতিবাহিত করেছেন।

স্মৃতির পাতায় তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের অনেক ঘটনা আজও অনুপ্রেরণা জোগায়। বিশেষ করে ৭ মার্চের ভাষণের প্রেক্ষাপট তৈরি এবং স্বাধীনতার সপক্ষে জনমত গঠনে তার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি যে সততা এবং দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছেন, তা বর্তমান প্রজন্মের রাজনীতিবিদের জন্য অনুকরণীয়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক ও বিনয়ী। ক্ষমতার উচ্চাসনে বসেও তিনি সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট অনুধাবন করতে পারতেন। মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার যে বিরল গুণ তার ছিল, তা তাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এক উচ্চাসন দিয়েছে।

তার বিদায় শুধু একটি জীবনের পরিসমাপ্তি নয়, বরং একটি ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার ইতি। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তার রেখে যাওয়া আদর্শ এবং দেশপ্রেমের গল্প বেঁচে থাকবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। ভোলাবাসীর কাছে তোফায়েল আহমেদ ছিলেন তাদের হৃদয়ের স্পন্দন। প্রতিটি বিপদে-আপদে তিনি ছিলেন তাদের পাশে। আজকের এই শোকের দিনে ভোলাবাসীর কান্না আর হাহাকার তা-ই প্রমাণ করে। মা-বাবার পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত এই মহান নেতার আত্মা যেন পরম শান্তিতে থাকে, এই প্রার্থনা এখন পুরো জাতির।

তোফায়েল আহমেদ যে শূন্যতা রেখে গেলেন, তা পূরণ হওয়ার নয়। তবে তিনি যে স্বপ্ন দেখে গেছেন, যে বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে তিনি রাজনীতি করেছেন, সেই সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ই হবে তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি। তিনি আজ মা-বাবার কোল ফিরে পেয়েছেন, পেয়েছেন চিরশান্তি। মা-বাবার পায়ের কাছে শায়িত এই মহান নেতা যেন আমাদের সবার জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকেন। তার স্মৃতি আমাদের এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগাবে। ইতিহাস তাকে মনে রাখবে একজন সাহসী যোদ্ধা, একজন অকুতোভয় নেতা এবং একজন অকৃত্রিম দেশপ্রেমিক হিসেবে। সবশেষে শুধু এটুকুই বলা যায়—বিদায় নেতা, বিদায় মহান স্থপতি। আপনার কীর্তি অমর, আপনার চেতনা অবিনশ্বর।


এ সম্পর্কিত আরো খবর