রাজধানীর মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত সন্তান থাকা সত্ত্বেও তার নিঃসঙ্গ মৃত্যু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন তুলেছে—বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য কতটা পালন করা হচ্ছে?
এই ঘটনার পর আবারও আলোচনায় এসেছে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’। আইনটি অনুযায়ী, প্রত্যেক সন্তানের জন্য তার পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। শুধু আর্থিক সহায়তাই নয়, তাদের চিকিৎসা, পরিচর্যা এবং সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করার দায়িত্বও সন্তানের ওপর বর্তায়।
আইনে বলা হয়েছে, কোনো পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকলে তারা পারস্পরিক আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করবেন। অর্থাৎ একজন সন্তানের ওপর পুরো দায়িত্ব চাপিয়ে না দিয়ে সবাইকে নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব নিতে হবে।
এ আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সন্তানদের পিতা-মাতার একসঙ্গে ও একই স্থানে বসবাসের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সন্তান তার পিতা, মাতা কিংবা উভয়কে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধ নিবাস বা অন্য কোথাও বসবাস করতে বাধ্য করতে পারবেন না। এটি বাবা-মায়ের মর্যাদা ও পারিবারিক বন্ধন রক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়।
আইনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে নিয়মিতভাবে পিতা-মাতার খোঁজখবর রাখতে হবে। তাদের স্বাস্থ্যগত অবস্থার প্রতি নজর দেওয়া, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচর্যা করাও সন্তানের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন নয়, নৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সন্তানের বেড়ে ওঠা, শিক্ষা এবং জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পিতা-মাতার অবদান অপরিসীম।
বাংলাদেশের পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোয় বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান ও দায়িত্ববোধ একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে আধুনিক জীবনযাত্রা, কর্মব্যস্ততা এবং পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার কারণে অনেক সময় প্রবীণরা অবহেলার শিকার হন।
আইনটি প্রণয়নের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল প্রবীণ পিতা-মাতার অধিকার সুরক্ষা এবং তাদের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব নিশ্চিত করা। সমাজে প্রবীণদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় এ আইন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি পারিবারিক মূল্যবোধ ও মানবিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করাও জরুরি। কারণ বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা, যত্ন ও সম্মান কোনো আইনের বাধ্যবাধকতার চেয়েও বড় সামাজিক দায়িত্ব।