ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এবং তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি সাম্প্রতিক বিস্ফোরক ও অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যের পর দেশজুড়ে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তাঁর এই বক্তব্যের পর বাংলাদেশে আলোচিত ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার তিন আসামিকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে নতুন করে তোড়জোড় শুরু করেছে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো। ‘বাংলাদেশে কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন, সবটাই জানি’— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এমন মন্তব্য এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের গভীর চক্রান্তের দিকেই আঙুল তুলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হত্যাকাণ্ডের শুরু থেকেই ইনকিলাব মঞ্চ দাবি করে আসছিল যে, দেশীয় কিছু চক্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় ভারতীয় আধিপত্যবাদ শরিফ ওসমান হাদিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যের পর সংগঠনটির সেই দাবি এখন আবার নতুন করে ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দেশের প্রধান প্রধান গণমাধ্যমগুলোতে বিষয়টি এখন নতুন করে আলোচনার প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি দাবি করেছে, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক এই বক্তব্য এটিই স্পষ্ট করে যে, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে এমন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সুনির্দিষ্ট সংস্থার সম্পৃক্ততা রয়েছে, যার আসল পরিচয় যদি প্রকাশ পায় তবে দেশজুড়ে ব্যাপক ও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে।
সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ বলছেন, শরিফ ওসমান হাদিকে কেবল তৎকালীন আওয়ামী লীগ-বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে হত্যা করা হয়েছে বলে ধরে নিলে সেটি মস্ত বড় ভুল হবে। এই হত্যাকাণ্ডে ভারতের কোনো সুনির্দিষ্ট ভূমিকা বা গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা এখন সময়ের দাবি। এর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে তারা আরও বলেছে, হত্যাকাণ্ডের পরপরই দেশের সীমান্ত পুরোপুরি সিল বা অবরুদ্ধ করার কথা থাকলেও, তৎকালীন সরকার তা করতে রহস্যজনকভাবে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। কেন খুনিদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হলো, সেই প্রশ্নও এখন জোরালো হচ্ছে।
আলোচিত এই শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলাটি প্রথমে থানা পুলিশ এবং পরবর্তীতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করে। তবে বর্তমানে আদালত ও বাদীর আপত্তির মুখে মামলাটি অধিকতর তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক এই চাঞ্চল্যকর মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, এই বক্তব্য চলমান তদন্তের জন্য কতটা প্রাসঙ্গিক এবং কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখবে সিআইডি। এ বিষয়ে সিআইডির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মামলাটির তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে এবং নতুন যেকোনো তথ্য বা রাজনৈতিক বক্তব্য সামনে এলে তা অবশ্যই আমলে নিয়ে আরও গভীরভাবে তদন্ত চালানো হবে।
সিআইডির হাতে থাকা তথ্য অনুযায়ী, শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পরপরই মূল অভিযুক্তরা অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্য হয়ে সরাসরি কলকাতায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের বিশেষ টাস্কফোর্স (এসটিএফ) অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। সিআইডির কর্মকর্তারা মনে করছেন, কলকাতায় গ্রেপ্তার হওয়া এই তিন আসামিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের অনেক অজানা তথ্য, মূল পরিকল্পনাকারী এবং গভীর রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব হবে। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে পুলিশের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইতোমধ্যে যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রয়োজনে এই বিষয়ে ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আবারও আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হবে বলে জানানো হয়েছে।
ঘটনার পটভূমি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রায় এক বছর আগে থেকেই তিনি এলাকায় অত্যন্ত অভিনব ও ব্যাপক প্রচারণা শুরু করেছিলেন। এর মধ্যেই গত বছরের ১২ ডিসেম্বর শরিফ ওসমান হাদিকে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা লক্ষ্য করে অতর্কিতে গুলি চালায়। মাথায় গুরুতর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাদিকে উদ্ধার করে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১২০(বি)/৩২৬/৩০৭/১০৯/৩৪ ধারায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়। পরবর্তীতে হাদির মৃত্যুর পর মামলাটি একটি নিয়মিত হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি এই মামলার তত্কালীন তদন্তকারী কর্মকর্তা, গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৭ জনের বিরুদ্ধে একটি চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ডিবির দেওয়া সেই চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, মূলত ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ থেকেই শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার এই নিখুঁত পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ডিবির দেওয়া চার্জশিটভুক্ত ১৭ জন আসামি হলেন— প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭) এবং তার সহযোগী আলমগীর হোসেন (২৬), তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী (৪৩), ফিলিপ স্নাল (৩২), মুক্তি মাহমুদ (৫১), জেসমিন আক্তার (৪২), হুমায়ুন কবির (৭০), হাসি বেগম (৬০), সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), মারিয়া আক্তার Лима (২১), কবির (৩৩), নুরুজ্জামান ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), সিবিয়ন দিও (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) ও ফয়সাল (২৫)।
তবে ডিবির দেওয়া এই চার্জশিটে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে গত ১৫ জানুয়ারি আদালতে একটি নারাজি আবেদন দাখিল করেন মামলার বাদী আব্দুল্লাহ আল জাবের। আদালত বাদীর সেই আবেদনটি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে মামলাটি অধিকতর এবং নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য সিআইডির কাছে হস্তান্তরের আদেশ দেন। ডিবির দাখিল করা চার্জশিটভুক্ত ১৭ জন আসামির মধ্যে বর্তমানে ১১ জন দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি আছেন। বাকি ৬ জন আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন। পলাতক এই আসামিরা হলেন— প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ, তার প্রধান সহযোগী আলমগীর হোসেন, রাজধানীর মিরপুরের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, ফিলিপ স্নাল, মুক্তি আক্তার এবং ফয়সালের বোন জেসমিন আক্তার।
শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার মূল মোটিভ বা কারণ তুলে ধরে সেই সময়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেছিলেন, প্রধান আসামি ফয়সাল নিজেও একসময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং ভুক্তভোগী হাদির পূর্ববর্তী বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্য ও অবস্থান থেকে এটা পরিষ্কার যে, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই এই ন্যাক্কারজনক হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর যৌথ পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় এই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়।
হত্যাকাণ্ডে জড়িত ১৭ জন আসামির কার কী ধরনের ভূমিকা ছিল, সে সম্পর্কে তৎকালীন তদন্তকারী সংস্থা ডিবি জানিয়েছিল যে, শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার সঙ্গে সরাসরি মাঠপর্যায়ে জড়িত ছিলেন ফয়সাল ও তার সহযোগী আলমগীর। ঘটনার দিন এই দুজন হাদিকে সার্বক্ষণিক অনুসরণ করছিলেন। একপর্যায়ে মোটরসাইকেলে করে পেছন থেকে এসে রিকশায় বসা হাদিকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত কাছ থেকে গুলি করা হয়। সেই সময় মোটরসাইকেলের চালকের আসনে ছিলেন আলমগীর হোসেন আর পেছনে বসে থাকা ‘শ্যুটার’ ফয়সাল সরাসরি মাথায় গুলি করেন। তদন্ত অনুযায়ী, শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল শ্যুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীরের দেশ থেকে পলায়নে ‘সার্বিক সহায়তাকারী’ হিসেবে মূল ভূমিকা রাখেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক আওয়ামী লীগ কাউন্সিলর ও পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী।
এছাড়া মূল আসামিদের দেশ থেকে পালাতে এবং অবৈধভাবে সীমান্ত পার করে দিতে ফয়সালের পরিবারের সদস্যসহ আরও ১২ জন বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন বলে পুলিশের অভিযোগে বলা হয়েছে। এর মধ্যে ফয়সালের দুলাভাই মুক্তি মাহমুদ, বোন জেসমিন, বাবা হুমায়ুন, মা হাসি, স্ত্রী সাহেদা, শ্যালক ওয়াহিদ, বান্ধবী মারিয়া এবং ঘনিষ্ঠজন কবির তাকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে সরাসরি সাহায্য করেন। অন্যদিকে, আসামিদের পালিয়ে যাওয়ার সুবিধার্থে ভাড়ায় চালিত গাড়ির ব্যবস্থা করে দেন নুরুজ্জামান। পরবর্তীতে ফিলিপ, সিবিয়ন, সঞ্জয় ও আমিনুল নামে চার ব্যক্তি ফয়সালকে অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিতে সরাসরি ফিল্ড পর্যায়ে সহায়তা করেন। অভিযোগপত্রভুক্ত সবশেষ অর্থাৎ ১৭ নম্বর আসামি ফয়সালকে গ্রেপ্তারের পরই মূলত হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মূল আগ্নেয়াস্ত্রটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়। অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছিল যে, ভবিষ্যতে এই মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে বা অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিললে একটি সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
ইতিমধ্যে এই ওয়ান হাদি হত্যা মামলার অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্ধারিত তারিখ আদালত কর্তৃক মোট ১৪ বার পিছিয়েছে। সর্বশেষ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ নির্ধারিত ছিল গত ১৭ মে। কিন্তু সেদিনও সিআইডি তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে না পারায় আদালত তারিখ পিছিয়ে নতুন তারিখ ধার্য করেন। আগামী ৭ জুন আবার এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নতুন তারিখ নির্ধারিত আছে। অধিকতর তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান জানান, চার্জশিটের বাইরে আমাদের নিজস্ব তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মো. রুবেল ও মাজেদুল নামে আরও দুজনকে সিআইডি গ্রেপ্তার করেছে। তারা ইতোমধ্যে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এর বাইরে মইনুদ্দিন শুভ নামে মোটরসাইকেল সরবরাহকারী মূল মালিককে আমরা শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছি এবং তাকে গ্রেপ্তারে আমাদের বিশেষ টিম কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, এই মামলার তদন্তে আমরা অত্যন্ত আন্তরিক ও সিরিয়াস। আমাদের দিক থেকে তদন্তের কাজ প্রায় শেষের দিকে। এখন এটার আরও বড় অগ্রগতি হতে পারে যদি মামলার মূল আসামি ফয়সাল ও আলমগীরকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়। তাদের আমাদের হেফাজতে নিয়ে আসতে পারলে খুব দ্রুতই আমরা তদন্ত শেষ করে আদালতে জমা দিতে পারব। ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া তিন আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনার অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী ওই আসামিদের ফিরিয়ে আনতে যা যা করা দরকার, সব ধরনের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ ইতোমধ্যে সিআইডির পক্ষ থেকে করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রীও এটা নিয়ে কথা বলেছেন এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট সব ডিপার্টমেন্ট কাজ করছে। আশা করি আমরা খুব দ্রুতই তাদের আনতে সক্ষম হবো এবং এই মামলায় যদি অন্য কোনো আন্তর্জাতিক বা দেশীয় রহস্য থাকে, তবে তা উন্মোচন করতে পারব।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি একটি আনুষ্ঠানিক বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে বন্দি ও পলাতক আসামিদের বিনিময় প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে ২০১৬ সালে এই চুক্তিটি সংশোধন করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, কোনো এক দেশে গুরুতর অপরাধ করে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করার জন্য নিজ নিজ দেশের কাছে হস্তান্তর করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী সাধারণত রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের প্রত্যর্পণ করা হয় না, তবে গুরুতর অপরাধ যেমন— হত্যা, খুন বা বিমান ছিনতাইয়ের মতো অপরাধগুলোকে কোনোভাবেই রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না এবং এদের প্রত্যর্পণ করা বাধ্যতামূলক। নিজ দেশের নাগরিক হলেও প্রত্যর্পণে কোনো আইনি বাধা নেই।
কলকাতার ধর্মতলায় গত মঙ্গলবার এক জনসভায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, বাংলাদেশের একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার আসামি ভারতের মেঘালয় দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের পর সেখানকার পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘দেশের স্বার্থে’ এ বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে কোনো কথা বলতে বা মুখ খুলতে নিষেধ করেন। মমতা তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়েছিল? সবটাই জানি।’ ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা অমিত শাহ। মমতা তাঁর বক্তব্যে ‘হোম মিনিস্টার’ (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) শব্দটি ব্যবহার করলেও সরাসরি অমিত শাহর নাম উল্লেখ করেননি। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে এক বড় খুনিকে আমাদের রাজ্য সরকারের বিশেষ টাস্কফোর্স (এসটিএফ) গ্রেপ্তার করেছিল, জেনে রাখুন, যা নিয়ে বাংলাদেশে বিপ্লব বা তোলপাড় হয়েছিল...। মেঘালয় দিয়ে বাংলায় চলে আসে, আমাদের এসটিএফ তাকে ধরে। তারপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে আমাকে ফোন করে বলেন...। এত দিন তো কই আমি বলিনি, মুখ খুলিনি…। আজকে অত্যাচারের শেষ সীমায় গেছেন বলে, আমি এখনো নামটা বলছি না ভদ্রতা করে। বাংলাদেশের লোক উত্তাল হয়ে যাবে, আমি সেটা চাই না, আমি দেশকে ভালোবাসি…।’
মমতার এমন বিস্ফোরক বক্তব্য আমলে নিয়ে সিআইডি তদন্ত করবে কি না, জানতে চাইলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আমাদের মূল কাজ এখন কলকাতায় গ্রেপ্তার থাকা তিন আসামিকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা। তাদের ফিরিয়ে আনা গেলে তদন্ত অনেক সহজ হবে। মমতা যে বক্তব্য দিয়েছেন তার সত্যতা কতটুকু নাকি এটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে তদন্ত করা হবে। সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধান উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আলি আকবর খান বলেন, ‘আমরা আমাদের তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছি। প্রত্যেক বক্তব্য, যে যেটাই বলুক, আমরা দেখব সেটি আমাদের তদন্তের সঙ্গে কতটুকু প্রাসঙ্গিক এবং এখান থেকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা ক্লু পাওয়া যায় কি না।’
অন্য দিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করা উচিত নয় বলে মনে করছেন দেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘একটা নির্বাচন হয়েছে পাশের দেশের একটি রাজ্যে। যিনি হেরে গেছেন তিনি নানা কথা বলছেন ওনাদের সরকারকে উদ্দেশ্য করে। সেটা নিয়ে এখানে বাংলাদেশের মন্তব্য করা উচিত হবে বলে আমি মনে করি না। এটা আমাদের আলোচনা করার মতো বিষয় নয়।’ তবে তিনি যোগ করেন, ‘ইতিমধ্যেই এটা নিয়ে কাজ চলছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খুব সিরিয়াসলি কাজ করছে। হাদি হত্যার বিচার আমরা চাই এবং যারা ধরা পড়েছে ভারতে, তাদের ফেরত এনে বিচার বাস্তবায়ন করতে হবে এবং দ্রুত করতে হবে। সে বিষয়ে আমরা সচেষ্ট আছি।’ তিনি আরও বলেন, চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সকল আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। ভারত সরকার চাইলে খুব দ্রুতই বন্দি বিনিময় সম্ভব।
এদিকে, শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার, খুনিদের অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ঘটনার পেছনে থাকা দেশি-বিদেশি চক্রান্তের মুখোশ উন্মোচনের দাবিতে নতুন করে রাজপথে নামার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ইনকিলাব মঞ্চ। তারা দেশজুড়ে মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে বলে জানিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে অনুষ্ঠিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, একটি বেসরকারি অনুসন্ধানী সংস্থা হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সম্ভাব্য খুনিদের পরিচয় প্রকাশ করলেও, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো খুনিরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর বিষয়টি সামনে এনেছে, যা অত্যন্ত রহস্যজনক। এই হত্যাকাণ্ডের শেষ না দেখে তারা মাঠ ছাড়বেন না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।