বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাগে শিশুসহ বয়স্করা মূলত এই ভাইরাসের পুরোনো একটি ধরনেই (ভেরিয়েন্ট) আক্রান্ত হচ্ছেন। দেশের দুটি শীর্ষস্থানীয় ল্যাবরেটরি বা পরীক্ষাগারে হামের জীবাণুর জিন বিশ্লেষণ বা জিনোম সিকোয়েন্সিং করে এই ধরন সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছেন দেশের বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা। তাঁরা স্পষ্ট করে বলছেন যে, এই হামের জীবাণু বাইরে থেকে বা অন্য কোনো দেশ থেকে আসেনি। সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের জাতীয় পোলিও, হাম, রুবেলা ল্যাবরেটরি এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে হামের জীবাণুর জিন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সম্পন্ন করা দুটি পরীক্ষাগারের বিশ্লেষণের ফল হুবহু একই এসেছে। তাতে সুনির্দিষ্টভাবে জানা গেছে, হামের ‘বি৩’ ধরনেই দেশের মানুষ ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হচ্ছে। এই ধরনটি অনেক বছর ধরেই বাংলাদেশে সক্রিয় রয়েছে।
এরই মধ্যে দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে ৬০০ ছাড়িয়েছে। বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাবে দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৭ জন মারা গেছেন। এ নিয়ে গতকাল পর্যন্ত কেবল উপসর্গ নিয়ে ৫১১ জনের এবং নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ৯০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করে, হামের উপসর্গ নিয়ে যেসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তা মূলত হামের কারণেই হয়েছে। তবে রোগ সময়মতো শনাক্তকরণের সীমাবদ্ধতার কারণে এগুলোকে নথিপত্রে ‘নিশ্চিত হামে মৃত্যু’ হিসেবে উল্লেখ করা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে হামের সংক্রমণে এত বিপুল সংখ্যক মৃত্যুর কোনো নজির নেই। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশের বয়সই পাঁচ বছরের কম। এই মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়েছে চলতি বছরের মার্চ মাসের শুরু থেকে এবং জুন মাসে এসেও এই মৃত্যুর ধারা অব্যাহত রয়েছে। জনস্বাস্থ্যবিদদের একটি অংশ গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ক্রমাগত অভিযোগ করে আসছেন যে, হাম ব্যবস্থাপনার মারাত্মক দুর্বলতার কারণে এই মৃত্যু কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক জাহিদ রায়হান জানান, সারা দেশে টিকা দেওয়ার পর বর্তমান সংক্রমণ অনেকটাই কমে এসেছে। সংক্রমণ কমার কারণে মৃত্যুর সংখ্যাও ধীরে ধীরে কমে আসবে। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন যে, দেশে এই সময়ে শিশুরা সাধারণত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং তাতেও মৃত্যু হয়। তাই সব মৃত্যুই যে হামে হচ্ছে, তা ঢালাওভাবে বলা ঠিক নয়।
হামের ধরন শনাক্তকরণের বিষয়ে জানা গেছে, সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের জাতীয় পোলিও মিজেলস রুবেলা ল্যাবরেটরি ২০১৪ সাল থেকে হাম শনাক্ত এবং হামের ধরন নিয়ে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ভাইরাস বিশেষজ্ঞ খন্দকার মাহবুবা জামিল জানান, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত ৩৫টি নমুনার হামের জীবাণুর জিন বিশ্লেষণ করে মূলত এই ‘বি৩’ ধরনের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই ল্যাবরেটরি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত এবং এর সমস্ত তথ্য নিয়মিতভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় পাঠানো হয়। পাশাপাশি সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরিতে গত মে মাসে আরও ৩৮টি নমুনার হামের জীবাণুর জিন বিশ্লেষণ করা হয়েছে, সেখানেও এই ‘বি৩’ ধরনটিই শনাক্ত হয়েছে।
বিজ্ঞানী ও গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্বে এ পর্যন্ত হামের মোট ২৪টি ধরন শনাক্ত হয়েছে। বাংলাদেশে অনেক বছর ধরেই এই ‘বি৩’ ধরনটিই প্রধান প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। ২০১৪ সালে এটি দেশে প্রথম ধরা পড়ে। এর মাঝে কেবল ২০১৭-২০১৮ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে হামের প্রাদুর্ভাবের সময় ‘ডি৮’ ধরন শনাক্ত হয়েছিল। তার পর থেকে সব সময় কেবল ‘বি৩’ ধরনই পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পুরোনো ধরনটিই যেহেতু ছড়াচ্ছিল, সুতরাং রোহিঙ্গা শিবির থেকে নতুন করে হাম ছড়িয়েছে—এমন বক্তব্য একেবারেই সঠিক নয়।
দুর্ভাগ্যবশত, হামের টিকার ঘাটতি এবং টিকা নিয়ে মাঠপর্যায়ে অনেক বিতর্ক তৈরি হওয়ায় আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যু কমাতে পারছে না স্বাস্থ্য বিভাগ। শুরু থেকেই হাম ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ত্রুটি ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। যেমন মার্চ মাসের শুরুর দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের অন্য সাধারণ অসুস্থ শিশুদের সঙ্গে একই ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকেরা এই রোগটি অত্যন্ত সংক্রামক জেনেও এমন অসতর্কতা দেখিয়েছিলেন।
সাধারণত হামে আক্রান্ত হলে শিশুর ডায়রিয়া হয়, কান পাকে এবং চোখে জটিল সমস্যা দেখা দেয়। অনেকের ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক নিউমোনিয়ায় রূপ নেয় এবং মূলত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুরাই মারা যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একাধিক সরকারি হাসপাতালে বাড়তি কিছু ভেন্টিলেটর দিয়েছে এবং পৃথক ওয়ার্ড খোলার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ডিএনসিসি মার্কেটের ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালকে হামের রোগীদের জন্য সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু এত কিছুর পরও মাঠপর্যায়ের অব্যবস্থাপনার কারণে মৃত্যু কমানো যাচ্ছে না। এই বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যা ঘটেছে, যা ঘটছে, তা খুবই দুঃখজনক। হামের একটা মহামারি হলো, অথচ আমরা তা ঠিকমতো ব্যবস্থাপনা করতে পারলাম না। এই ঘটনাটি রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা পায়নি। এটা মেনে নেওয়া সত্যিই কঠিন।”