‘স্বজন, বন্ধুবান্ধব, এনজিও—কারও কাছে হাত পাততে বাকি রাখিনি। সব মিলিয়ে ছয় লাখ টাকা খরচ করেছি। ছেলেদের বাঁচানোর জন্য হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরেছি, তবু বুকের দুই ধনকে বাঁচাতে পারলাম না।’ এভাবেই নিজের যমজ দুই সন্তানকে হারানোর শোক বর্ণনা করছিলেন চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের হারুনুর রশিদ।
হারুনুর রশিদ ও ইসরাত জাহান দম্পতির যমজ সন্তান ছিল গত বছরের ১৬ এপ্রিল জন্ম নেওয়া আবদুল্লাহ আল ফাহিম ও আবদুল্লাহ আল নোমান। মাত্র এক বছরের মাথায় হামের উপসর্গ নিয়ে ১২ দিনের ব্যবধানে দুই শিশুই প্রাণ হারিয়েছে। এই শোকের পাশাপাশি এখন ছয় লাখ টাকা ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিশেহারা বাবা।
হারুনুর রশিদ জানান, তিনি মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ইউনিয়নের পূর্ব খৈয়াছড়া তাকিয়াপাড়ার বাসিন্দা। বাজারে ছোট একটি মুদি দোকান চালিয়েই তাদের সংসার চলে। গত মার্চ মাস থেকে সন্তানদের চিকিৎসা করতে গিয়ে গত তিন মাস দোকান খুলতে পারেননি। ধারদেনা করে প্রায় ছয় লাখ টাকা খরচ করেও শেষরক্ষা হয়নি।
গত ২২ মে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রথমে নোমানের মৃত্যু হয়। এরপর ফাহিমের অবস্থা আরও জটিল হলে তাকে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরে নারায়ণগঞ্জের একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত মঙ্গলবার ফাহিমও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। বুধবার রাতে জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
ফাহিম ও নোমানের বাবা বলেন, ‘ জন্মের পর থেকেই দুই ছেলে ছিল বেশ চঞ্চল ও প্রাণবন্ত। গত ৮ মার্চ ফাহিমের শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে ১৮ মার্চ তার হাম শনাক্ত হয়। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে নোমানেরও হামের উপসর্গ দেখা দেয় এবং তারও হাম শনাক্ত হয়। হাসপাতালে না খেয়ে থেকেছি, কিন্তু টাকা খরচ করেও ছেলেদের ফিরে পেলাম না।’
প্রতিবেশী আলমগীর হোসেন জানান, শিশু দুটি অত্যন্ত সুন্দর ও হাসিখুশি ছিল, এলাকার সবাই তাদের খুব আদর করত। একই পরিবারের দুই শিশুর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বৃহস্পতিবার সকালে হারুনুর রশিদের বাড়িতে স্বাস্থ্যকর্মীরা শিশু দুটির মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। মায়ের কোলে আর ফেরা হলো না ফাহিম ও নোমানের, রেখে গেল অপূরণীয় শূন্যতা।