বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) কর্মসূচির আওতায় দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা শুধু সড়ক, সেতু কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মতো প্রচলিত অবকাঠামোগত খাতেই সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না চীন। এর বাইরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি, নতুন উদ্ভাবন, সবুজ বা পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, সামুদ্রিক সহযোগিতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার মতো বহুমুখী ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারিত্ব বাড়াতে বিশেষভাবে আগ্রহী দেশটি। মূলত তিনটি বড় বিষয়ের অধীনে মোট ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে চীন। দেশটির জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশনের (এনডিআরসি) একটি বিশদ সহযোগিতা পরিকল্পনা প্রস্তাবে এই তথ্যগুলো তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলতি মাসে নির্ধারিত চীন সফরকে সামনে রেখে এই বিশেষ প্রস্তাবগুলো প্রস্তুত করেছে এনডিআরসি।
সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ-চীন যৌথ বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ (বিআরআই) এগিয়ে নেওয়ার সহযোগিতা পরিকল্পনা’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ খসড়া নথি বেইজিংয়ের বাংলাদেশ দূতাবাস সরাসরি ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় আলোচনা এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছে বেইজিং। যাতে প্রধানমন্ত্রীর এই গুরুত্বপূর্ণ সফর শুরু হওয়ার আগেই দ্বিপক্ষীয় নথিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করা সম্ভব হয়। এই খসড়া নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঐতিহাসিক বাংলাদেশ সফরের সময় বিআরআই কাঠামোর আওতায় যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল, মূলত তার ওপর ভিত্তি করেই এই নতুন খসড়া পরিকল্পনাটি তৈরি করা হয়েছে। খসড়া নথিতে আন্তর্জাতিক শান্তি, উন্মুক্ততা, পারস্পরিক লাভ এবং টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বিআরআই সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করার কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব, স্বচ্ছ এবং জনগণকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চীনের প্রস্তাবিত ২৩টি সহযোগিতা খাতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ সুরক্ষা। এ ছাড়াও এই নতুন পরিকল্পনায় খাতভিত্তিক গভীর সহযোগিতা প্ল্যাটফর্ম, নীতিগত সহায়তা ব্যবস্থা এবং দুই দেশের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় কাঠামো গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে ডিজিটাল অর্থনীতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশকে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড আন্তর্জাতিক ডিজিটাল অর্থনীতি সহযোগিতা উদ্যোগে’ সরাসরি যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল অর্থনীতি বিষয়ে দুই দেশের মহাপরিচালক পর্যায়ের একটি যৌথ কমিটি গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি ক্লাউড কম্পিউটিং, তথ্য ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর সামগ্রিক উন্নয়নে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ানোর কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। খসড়া নথিতে বহু আলোচিত তিস্তা প্রকল্পের বিষয়ে সরাসরি কোনো উল্লেখ না থাকলেও পানি সম্পদ, আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং অবকাঠামো সহযোগিতার বিষয়টি দৃঢ়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যার ফলে প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলাদা আলোচনা কিংবা বড় কোনো ঘোষণা আসতে পারে বলে কূটনৈতিক মহলে জোরালো ধারণা করা হচ্ছে।
এ ছাড়াও চীন বাংলাদেশকে তাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ও প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে চায়না ইন্টারন্যাশনাল ইমপোর্ট এক্সপো, চায়না ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট ফেয়ার এবং চায়না-সাউথ এশিয়া এক্সপোজিশন। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড গ্রিন ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’-এ যোগ দেওয়ার বিশেষ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং কম-কার্বন নিঃসরণ উন্নয়ন নিয়ে একটি নতুন সমন্বয় ব্যবস্থার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে নিয়মিতভাবে চীনা ভাষা শিক্ষা ফোরামের আয়োজন, গবেষক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে পারস্পরিক বিনিময় বৃদ্ধি এবং থিংক-ট্যাংক বা গবেষণা সংস্থা পর্যায়ে সংলাপ সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া চিকিৎসা প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য এবং ওষুধশিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে চীন, যা মহামারির পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তার বিষয়ে তাদের বাড়তি গুরুত্বেরই স্পষ্ট প্রতিফলন। এই খসড়ায় কৃষি, জ্বালানি, সামুদ্রিক সহযোগিতা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও একগুচ্ছ নতুন উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। কূটনীতিকরা বলছেন, আগে বিআরআই মূলত সড়ক, সেতু, বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকেন্দ্রিক থাকলেও এখন ডিজিটাল সংযোগ, তথ্যভিত্তিক অর্থনীতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশে উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং নতুন চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের এক বিরাট সুযোগ তৈরি হতে পারে।