রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী এলাকায় একের পর এক শিশু নিখোঁজ ও রহস্যময় অপরাধের ঘটনায় তীব্র আতঙ্ক ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি পল্লবীতে আলোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া শিশু রামিসার বাসার ঠিক পাশের বাড়ি থেকেই এবার ইব্রাহিম নামের মাত্র ৫ বছর বয়সী আরেক শিশু নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঘটনার পারিপার্শ্বিক অবস্থা, সময় এবং সিসিটিভি ফুটেজ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে নিখোঁজ শিশুটির অভিভাবকরা এক গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, সিসিটিভি ফুটেজে শিশুটির আশপাশে শেষবার যাকে দেখা গেছে, তিনি অন্য কেউ নন, বরং ওই বাড়িরই বাড়িওয়ালার ছেলে। এই ঘটনার পর থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে পুরো এলাকায়। ইতিমধ্যেই এই নিখোঁজের ঘটনায় থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাড়িওয়ালার ছেলের এই ঘটনার সাথে সরাসরি যুক্ত থাকার বিষয়ে তাদের হাতে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই।
নিখোঁজ ইব্রাহিমের অসহায় বাবা-মা অত্যন্ত আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, প্রতিদিনের মতো ঘটনার দিনও বাসার সামনের গলিতে অন্য শিশুদের সাথে আপনমনে খেলাধুলা করছিল ইব্রাহিম। কিন্তু সন্ধ্যা নামার পর সে আর ঘরে ফিরে আসেনি। পরবর্তীতে নিখোঁজের সন্ধানে চারপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হলে এক রহস্যময় ও গা শিউরে ওঠা দৃশ্য সামনে আসে। সিসিটিভি ফুটেজের সময় অনুযায়ী, সন্ধ্যা ঠিক ৭টা ২১ মিনিটে ইব্রাহিমকে হঠাৎ খেলার মাঠ ছেড়ে দৌড়ে বাসার ভেতরে প্রবেশ করতে দেখা যায়। তবে সে একা ছিল না; ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে তার ঠিক পেছনে পেছনে একজন ব্যক্তিও বেশ তড়িঘড়ি করে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করছেন। ভেতরে যাওয়ার ঠিক কিছুক্ষণের মধ্যেই ভবনের নিচতলা থেকে ইব্রাহিমের একটি তীব্র ও আকস্মিক চিৎকার শুনতে পান আসেপাশের মানুষ। এর মাত্র কয়েক মিনিট পরেই সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ভেতরে প্রবেশ করা সেই অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি অত্যন্ত তাড়াহুড়ো এবং আতঙ্কিত অবস্থায় বাসা থেকে বের হয়ে প্রধান সড়ক দিয়ে চম্পট দিচ্ছেন। কিন্তু এরপর থেকে ইব্রাহিমের আর কোনো সন্ধান মেলেনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভুক্তভোগী শিশুটির পরিবার বর্তমানে যে বহুতল ভবনে বসবাস করছে, সেটি নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া রামিসাদের ভবন থেকে মাত্র ৩ গলি দূরে অবস্থিত। এই বাড়িটির ছাদে সাধারণ ভাড়াটিয়া বা অন্য কাউকে সচরাচর যেতে দেওয়া হয় না এবং নিরাপত্তার স্বার্থে ছাদটি সর্বদা তালাবদ্ধ থাকে। ঘটনার সময়ও ছাদটি যথারীতি তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ছাদে যাওয়ার একমাত্র চাবিটি সার্বক্ষণিকভাবে বাড়ির মালিকের নিজস্ব জিম্মায় থাকে। ফলে এত অল্প সময়ের মধ্যে এবং তালাবদ্ধ ভবনের ভেতর থেকে শিশুটি কীভাবে ও কোথায় উধাও হয়ে গেল, তা নিয়ে এক বিশাল রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারটি জানিয়েছে, তারা দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর ধরে অত্যন্ত সুনামের সাথে এই এলাকায় বসবাস করে আসছেন। দীর্ঘ এই সময়ে প্রতিবেশীদের কিংবা এলাকাবাসীর সঙ্গে তাদের কখনো কোনো ধরনের ছোটখাটো ঝগড়া, বিবাদ বা মনোমালিন্য হয়নি। ফলে কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে এই ঘটনা ঘটেছে বলে তারা মনে করছেন না।
তবে নিখোঁজ শিশুর পরিবারের সরাসরি অভিযোগ, বাড়িওয়ালার দুই ছেলে মারাত্মকভাবে মাদকাসক্ত এবং তারা দীর্ঘদিন ধরে ইন্টারনেটে বিভিন্ন ধরনের অনলাইন জুয়ার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। জুয়া খেলায় বিপুল পরিমাণ অর্থ হেরে যাওয়া এবং মাদকের চড়া দামের টাকা জোগাড় করতেই তারা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই অপহরণের ছক কষেছে বলে পরিবারের জোরালো সন্দেহ। এ বিষয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে ইব্রাহিমের বাবা বলেন, ‘আমরা এখানে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে শান্তিতে আছি। কারও সঙ্গে আমাদের কোনো শত্রুতা নেই। বাড়িওয়ালার দুই ছেলে নিয়মিত নেশা করেন আর অনলাইন জুয়া খেলেন। আমাদের শতভাগ ধারণা, জুয়া ও মাদকের মোটা অঙ্কের টাকা জোগাড় করার জন্যই তারা আমার নিষ্পাপ সন্তানকে অপহরণ করে কোথাও আটকে রেখেছেন।’
এই রহস্যজনক নিখোঁজের ঘটনার পর পল্লবী থানায় একটি লিখিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলাটির দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, ‘নিখোঁজ শিশুটির পরিবার দুদিন আগে থানায় একটি নিখোঁজ ও অপহরণের মামলা দায়ের করেছে। আমরা সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত কার্যক্রম চালাচ্ছি। তবে প্রাথমিক এজাহারে বা মৌখিকভাবে তারা আমাদের কাছে বাড়িওয়ালার ছেলেদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কোনো অভিযোগ দায়ের করেননি।’ অন্যদিকে মামলার অগ্রগতির বিষয়টি নিশ্চিত করে মিরপুর জোনের ডিসি মোস্তাক সরকার বলেন, ‘ভুক্তভোগীর পরিবার এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে বাড়িওয়ালার ছেলের অপরাধে জড়িত থাকার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাননি। সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করা হচ্ছে, তবে এমন কোনো অকাট্য প্রমাণও এখন পর্যন্ত পুলিশের হাতে নেই। যদি তারা সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ করেন বা তদন্তে কোনো সূত্র পাওয়া যায়, তবে আমরা অবশ্যই বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখব এবং অপরাধীকে আইনের আওতায় আনব।’