দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে যাচ্ছে। বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শত শত মিলিয়ন ডলারের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) এক বিশাল বড় আশা নিয়ে অবশেষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) টেবিলে উঠছে বহু প্রতীক্ষিত চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল নির্মাণ প্রকল্প। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক হাব চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রায় ৮০০ একর বিস্তীর্ণ ভূমিজুড়ে এই মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করতে মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। আজ মঙ্গলবার দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সর্বোচ্চ ফোরাম একনেক সভায় এই বড় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে, যেখানে সভাপতিত্ব করবেন স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় কর্ণফুলী নদীর মোহনার ঠিক কাছাকাছি এক অপরূপ ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানে এই বিশেষ চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার নকশা তৈরি করা হয়েছে, যা দেশের রপ্তানি খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এই নতুন চীনা প্রকল্পের আলোর পেছনের অন্ধকার গল্পটিও বেশ আলোচিত হচ্ছে। এর আগে একসময়ে দেশের লাখো যুবকের কর্মসংস্থানের এক সুবর্ণ স্বপ্ন দেখানো মিরসরাইয়ের ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পটি সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে এক প্রকার পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়েছে। মিরসরাইয়ের প্রায় ৯০০ একর বিশাল জায়গায় ৯১৯ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে শুরু হওয়া সেই গুরুত্বপূর্ণ ভারতীয় প্রকল্পটি মাঝপথে এসে গত ফেব্রুয়ারি মাসেই সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সেই ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই এবার বেইজিংয়ের সরাসরি অর্থায়নে নতুন এই চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলটি একনেক সভায় উঠছে। এই চীনা শিল্পাঞ্চলটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে সেখানে অন্তত এক লাখ মানুষের বিশাল কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং একই সাথে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ বিপুল বিদেশী বিনিয়োগ আসবে বলে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ বোর্ড অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে আশা প্রকাশ করছে।
আর্থিক কাঠামোর দিক থেকে বিচার করলে, এই বৃহৎ প্রকল্পে সরকারের নিজস্ব তহবিল বা জিওবি থেকে জোগান দেওয়া হবে ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা এবং বাকি সিংহভাগ অর্থাৎ প্রকল্প সাহায্য হিসেবে চীন সরকারের কাছ থেকে ঋণ বা অনুদান আকারে আসবে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা। যদি আজ একনেক সভায় প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়, তবে এর আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে আগামী জানুয়ারি ২০২৭ থেকে শুরু করে ডিসেম্বর ২০৩১ সাল পর্যন্ত। অর্থাৎ আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ পুরোপুরি শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কিন্তু এই বিশাল মেগা প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয় বরাদ্দ নিয়ে ইতিমধ্যেই সরকারের ভেতরেই নানা ধরনের গুরুতর প্রশ্ন ও আপত্তির ঝড় উঠেছে। দেশের উন্নয়ন বাজেট তদারকিকারী সংস্থা পরিকল্পনা কমিশন এই প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট কিছু খাতের আকাশচুম্বী ব্যয় নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছে। প্রকল্পের নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সেখানে মাত্র ৩৩০ মিটার একটি সেতুসহ ১০ মিটার প্রস্থের ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ রাস্তা নির্মাণের জন্যই বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২২৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। গাণিতিক হিসাব কষলে দেখা যায়, এই খাতে প্রতি এক মিটার রাস্তা ও সেতু নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ১৮ লাখ ৩৭ হাজার টাকা, যা যেকোনো সাধারণ অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে অস্বাভাবিক রকমের বেশি।
শুধু তাই নয়, ২৪ মিটার প্রস্থের অপর একটি ১ হাজার ১৮১ মিটার রাস্তা নির্মাণের জন্য প্রতি মিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। এর বাইরেও জরুরি ব্যবহারের জন্য দুটি পানি সংরক্ষণাগার বা ওয়াটার রিজার্ভার নির্মাণে এক লাফে ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মনে করছেন, পুরো প্রকল্পটির সামগ্রিক ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে অন্তত ১৩৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত বা বাড়তি ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। এই বিশাল অঙ্কের অযৌক্তিক ও অতিরঞ্জিত ব্যয় নিয়েই মূলত পরিকল্পনা কমিশন তীব্র আপত্তি ও প্রশ্ন তুলেছে, যা আজকের একনেক সভায় আলোচনার টেবিলে বেশ গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।