ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

নবম পে-স্কেলের চাপে পরিচালন ব্যয় বেড়ে ৬ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ০৯ জুন, ২০২৬ সময় : ৬:১৫ পিএম

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যয় সংকোচনের নানা ঘোষণা ও কৃচ্ছ্রসাধন নীতি থাকলেও আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে পরিচালন ব্যয়ের লাগাম টানা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রে তীব্র ধারণা করা হচ্ছে, বহুল আলোচিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের চূড়ান্ত উদ্যোগ নেওয়ায় শেষ মুহূর্তে অনুৎপাদনশীল এ খাতে আরও ৮ হাজার কোটি টাকার বিপুল অতিরিক্ত বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে সরকারের সামগ্রিক পরিচালন ব্যয় লাফিয়ে বেড়ে রেকর্ড ৬ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, যা ৩ লাখ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) দ্বিগুণেরও বেশি। বিশাল এই পরিচালন ব্যয় মেটাতে গিয়ে একদিকে যেমন দেশের মূল অবকাঠামোগত উন্নয়ন খাত সংকুচিত হয়ে পড়ছে, তেমনই সামগ্রিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির এক নতুন ও ভয়াবহ চাপ তৈরি হতে পারে বলে তীব্র আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি করলেই হবে না, বরং কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে রাজস্ব আয় এবং সরকারি সেবার মান দৃশ্যমানভাবে বাড়াতে না পারলে বিশাল ঘাটতির এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকে জানা যায়, এর আগে মে মাসে বাজেটের প্রাথমিক রূপরেখা বা খসড়া তৈরির সময় পরিচালন ব্যয়ের জন্য ৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার একটি প্রাথমিক প্রস্তাব ছিল। একই সঙ্গে দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দের অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু সম্প্রতি নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের সরকারি সিদ্ধান্ত সামনে আসার পর অর্থনীতির পুরো হিসাবনিকাশ ও ছক ওলটপালট হয়ে বদলে যায়। নতুন এই বৈপ্লবিক পে-স্কেলের প্রথম ধাপ কার্যকর করতেই বাজেটে অতিরিক্ত আরও ৩৭ হাজার কোটি টাকার বিশাল ফান্ডের প্রয়োজন হবে। তাই সব দিক বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত পরিচালন ব্যয়ে আরও ৮ হাজার কোটি টাকা যুক্ত করতে বাধ্য হয়েছে অর্থ বিভাগ। এর ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সামগ্রিক বাজেটের বিশাল আকার বেড়ে হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থ বিভাগের পদস্থ কর্মকর্তারা এই বিষয়ে বলছেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বাড়বে। এতে বাজারে নতুন চাহিদা বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সাময়িক কিছু ইতিবাচক বা চাঙ্গাভাব প্রভাব পড়তে পারে। তবে উৎপাদন খাতের পরিধি না বাড়িয়ে এভাবে শুধু ভোগ ব্যয় বাড়লে বাজারে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থেকে যায়।

এ প্রসঙ্গে দেশের সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক মতামত প্রকাশ করে বলেন, বহু বছর ধরে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের কোনো সমন্বয় বা পরিবর্তন করা হয়নি। বর্তমান বাজারে চরম মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার লাগামহীন ব্যয় বিবেচনায় নিলে এই বেতন বাড়ানোটা অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। তবে এই বিপুল বাড়তি ব্যয়ের বিপরীতে প্রশাসনের সামগ্রিক দক্ষতা ও জনগণের সেবার মানও সমহারে বাড়াতে হবে। প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া শুধু বেতন বৃদ্ধি করলে রাষ্ট্রের ব্যয় কেবল জ্যামিতিক হারে বাড়বে; কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য কোনো কাঙ্ক্ষিত বা ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে না। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে সরকারের সবচেয়ে বড় ও প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা। যদি রাজস্ব আহরণ আশানুরূপভাবে না বাড়ে, তাহলে এই বাড়তি সরকারি ব্যয় মেটাতে সরকারকে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হতে হবে। এতে করে দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত বা বাধাগ্রস্ত হওয়ার গভীর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এদিকে পরিচালন ব্যয়ের এই লাগামহীন ও আকাশচুম্বী বৃদ্ধির কারণে ক্রমাগত সংকুচিত ও অবহেলিত হয়ে পড়ছে দেশের মূল উন্নয়ন খাতের পরিধি। ফলে দেশজুড়ে থমকে যাচ্ছে নতুন নতুন মেগা অবকাঠামো নির্মাণ এবং সরাসরি সরকারি বিনিয়োগের স্বাভাবিক গতি। একটি উন্নয়নশীল দেশের টেকসই অগ্রযাত্রার জন্য পরিচালন ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে একটি সুস্থ ও বৈজ্ঞানিক ভারসাম্য থাকা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন শীর্ষ অর্থনীতিবিদেরা। তারা বলছেন, বাজেটে এই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হলে সরকারকে কঠোর ব্যয় সংকোচন নীতি, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ, বিলাসবহুল সরকারি গাড়ি কেনা এবং অনুৎপাদনশীল খাতের খরচ কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অন্যদিকে, রাজস্ব আয় বাড়ানো, ক্রুটিপূর্ণ ভর্তুকি ব্যবস্থার আধুনিক সংস্কার, এডিপি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো খাত উন্নয়নে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারি ব্যয়ের নিপুণ দক্ষতা এবং দেশের সামগ্রিক রাজস্ব খাতের কাঠামোগত দ্রুত সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে যে কোনো ধরনের অপ্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয়, বিলাসিতা বা অপচয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারকে শুধু বরাদ্দের আকার ও জিডিপির সংখ্যা না বাড়িয়ে ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ধরে রাখতে এবং মূল্যস্ফীতির হাত থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে সরকারকে অবশ্যই কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন নীতি ও সুশাসন অনুসরণ করতে হবে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর