বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সবসময়ই একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অবস্থিত বিএসএফ সদর দফতরে চার দিনব্যাপী এই উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক সম্মেলন শুরু হয়েছে। দুই দেশের বিস্তীর্ণ সীমান্তে যখন পুশইন বা জোরপূর্বক পুশব্যাক করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম কূটনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনা চলছে, ঠিক তখনই এই সংকট সমাধানের লক্ষ্যে দুই বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা আলোচনায় বসেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, গত মে মাস থেকেই বাংলাদেশের বিভিন্ন কৌশলগত সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে পুশইনের এক ধারাবাহিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত চেষ্টা চালিয়ে আসছে ভারতীয় পক্ষ।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বেশ কয়েকটি সীমান্ত এলাকা দিয়ে বাংলা ভাষাভাষী নিরীহ নারী, পুরুষ ও শিশুদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইনের (ঠেলে পাঠানো) চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) জওয়ানদের কঠোর ও অতন্দ্র বাধার মুখে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারেননি। পরিস্থিতি এতটাই জটিল রূপ নিয়েছে যে, কয়েকটি সীমান্তে পুশইনের শিকার হওয়া অনেক মানুষ এখনও নো-ম্যানস ল্যান্ড বা সীমান্ত শূন্যরেখায় অত্যন্ত অমানবিক পরিস্থিতিতে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন। স্বাভাবিকভাবেই চলমান চার দিনব্যাপী এই মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনে এই জ্বলন্ত সমস্যাটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফের পক্ষ থেকে তাদের আলোচনার এজেন্ডা বা আলোচ্য সূচিতে কিছু নিজস্ব দাবি তুলে ধরা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে—বিএসএফ জওয়ান ও ভারতীয় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর কথিত বাংলাদেশি নাগরিকদের হামলা প্রতিরোধ করা, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ ও চোরাচালান বন্ধ করা, অভিযুক্ত বাংলাদেশি অপরাধীদের ভারতে প্রবেশ রোধ করা, ভারতীয় সীমান্তে নির্মিত কাঁটাতারের বেড়া ভাঙার ঘটনা প্রতিরোধ, ভারতীয় সীমান্তে আরও নতুন বেড়া নির্মাণ করা, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যদি কোনো ভারতীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠী (আইআইজি) অবস্থান করে থাকে তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া এবং সামগ্রিক সীমান্ত অবকাঠামো উন্নয়ন সম্পর্কিত নানা কারিগরি বিষয়।
তবে বাংলাদেশের সীমান্ত ও কূটনৈতিক কর্মকর্তারা অত্যন্ত জোরালোভাবে বলছেন, এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ঢাকার পক্ষ থেকে প্রধান এবং এক নম্বর ইস্যু হিসেবে পুশইনের সাম্প্রতিক নজিরবিহীন ঘটনাগুলোকে টেবিল উপস্থাপন করা হবে। কারণ জোরপূর্বক নিরপরাধ মানুষকে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া একটি মারাত্মক মানবিক অপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এর পাশাপাশি সীমান্ত সংক্রান্ত অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি জটিল ইস্যু নিয়েও এই সম্মেলনে কঠোর আলোচনা হবে। এর বাইরেও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন এবং সীমান্ত-সম্পর্কিত যেকোনো তাৎক্ষণিক সমস্যা দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে দুই দেশের সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (সিবিএমপি) আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা, আকাশসীমা লঙ্ঘন করে অবৈধ ড্রোন বা হেলিকপ্টার উড্ডয়ন চিরতরে বন্ধ করার বিষয়টিও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তোলা হবে। একই সঙ্গে ভারতীয় মূলধারার গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশ ও সীমান্তবর্তী অঞ্চল সম্পর্কে যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নেতিবাচক ও উসকানিমূলক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করা এবং উভয় বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক পেশাদার আস্থা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন ফলপ্রসূ ও ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বলেছেন, “এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে সীমান্ত পরিস্থিতি, দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা এবং বিশেষ করে অবৈধ পুশইনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে ভারতের কাছে তুলে ধরা হবে। বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের এই বৈঠক নিয়মিত প্রথা অনুযায়ী একবার বাংলাদেশে এবং পরেরবার ভারতে অনুষ্ঠিত হয়।” তিনি আরও যোগ করে বলেন, “সেখানে সীমান্ত সুরক্ষার সব বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হবে। আমরা ইতিমধ্যেই কূটনৈতিক চ্যানেলে বিষয়গুলো নিয়ে নয়াদিল্লির সাথে প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা করছি এবং আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বর্তমান সরকার সব ধরনের অবৈধ পুশইনের অন্যায্য চেষ্টা প্রতিহত করতে পুরোপুরি প্রস্তুত। তবে আমরা মনে করি, প্রতিবেশী দেশের সাথে এসব দ্বিপাক্ষিক সমস্যা প্রাথমিকভাবে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধান করা উচিত।”
ভারত থেকে সীমান্ত দিয়ে আকস্মিক এই ‘পুশইন’ ইস্যুকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানানো হলেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তা যথাযথভাবে অনুসরণ করছে না বলে ঢাকা প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও অভিযোগ উঠেছে। গত এক মাস ধরে সীমান্তের বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার যে চেষ্টা চলছে, মানবাধিকার কর্মীরা একে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন। মানবাধিকার বিজ্ঞানীদের মতে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো দেশের নাগরিক যদি অবৈধভাবে অন্য দেশে অনুপ্রবেশ করে, তবে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে যথাযথ প্রক্রিয়ায় তার নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাই করে ফেরত পাঠানোর নিয়ম রয়েছে। কিন্তু কোনো প্রকার আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই জোরপূর্বক সীমান্তে মানুষকে পুশইন করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের মারাত্মক ও স্পষ্ট লঙ্ঘন, যার স্থায়ী সমাধান এই ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলনে মিলবে কি না, তা নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ করছেন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।