ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড থেকে নাবিল গ্রুপ কর্তৃক ৭০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা আর ফেরত না দেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানিয়েছেন, নাবিল গ্রুপকে এলসির (লেটার অব ক্রেডিট) বিপরীতে এই বিশাল অঙ্কের লোন দেওয়া হলেও পরবর্তীতে মালামাল বিক্রি করে সেই টাকা আর ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়নি। একই সাথে এই বিপুল অর্থ একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী তহবিলের পাশাপাশি একটি টিভি চ্যানেল প্রতিষ্ঠায় ব্যবহার করা হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
গতকাল মঙ্গলবার (৯ জুন) বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় (বাজেট) অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জনশ্রুতি বা দুষ্টু লোকেরা বলে—নাবিল গ্রুপের সেই ৭০০ কোটি টাকা কোনো এক নির্দিষ্ট দলের নির্বাচনী তহবিলে গেছে এবং সেই অর্থ দিয়ে তারা একটি নতুন টিভি চ্যানেলও প্রতিষ্ঠা করেছে। বর্তমানে সেই চ্যানেলটা কোন পক্ষের হয়ে মাঠে খেলছে, সেটা আমাদের সবারই ভালোভাবে জানা আছে।’ তিনি আরও জানান, নাবিল গ্রুপের মোট ব্যাংক দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া লান্তাবুর গ্রুপ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে হেড অফিসের কোনো ধরনের পূর্ব অনুমোদন ছাড়াই নির্বাচনের ঠিক আগে ৪০ কোটি টাকা লোন দেওয়া হয়েছে, যার কোনো সদুত্তর বা বৈধ নথিপত্র ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারেনি। এসব আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে সরকার কঠোর তদন্ত করবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের অন্যতম বৃহৎ এই বেসরকারি ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা খাত বা সিএসআর (CSR) ফান্ডের অর্থ নয়ছয়ের বিষয়টিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সিএসআর ফান্ডের পবিত্র অর্থ দিয়ে ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিমানের টিকিট কাটার মতো নজিরবিহীন অনিয়ম সংগঠিত হয়েছে, যা ইতিপূর্বে দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে। এসব অনিয়মের পেছনে কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত করা হবে।
বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর নাম সরাসরি উল্লেখ না করে, নির্বাচনে দলটির পক্ষে ইসলামী ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থায়ন করা হয়েছে বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি ব্যাংকের ‘আরডিএস’ (রুরাল ডেভেলপমেন্ট স্কিম) বা পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প নামের একটি ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে বলেন, এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ভোটের ঠিক আগে আরডিএস প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ এলাকার অনেক নারীকে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে আমাদের এক কর্মী এক বৃদ্ধা মাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন—মা, আপনি ভোট কোথায় দিলেন? তখন সেই মা উত্তর দেন, বাবা কুরআনের দলে ভোট দিয়েছি, না দিলে তো জান্নাতে যাওয়া যাবে না। ভোট দেওয়ার জন্য ১০ হাজার টাকাও দিয়েছে এবং বলেছে এই ঋণ মাফ হয়ে যাবে, পরে আরও ১০ হাজার টাকা পাওয়া যাবে। এভাবে বোনাস হিসেবে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে জান্নাত পাওয়ার নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়েছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এই আরডিএস প্রকল্পের মাধ্যমে মোট ২২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। যার মধ্যে আগে দেওয়া হয়েছিল ১১ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য তড়িঘড়ি করে আরও ১১ হাজার কোটি টাকা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিতরণ করা হয়েছে। দেশের ব্যাংকিং খাতের এমন সব লুটপাট ও অনিয়ম রুখতে বর্তমান সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে বলে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন।