বিশেষ প্রতিনিধি, আব্দুল কাইয়ুম খান
বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল প্রবেশদ্বার বা গেটকিপার হিসেবে কাজ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাস্টমস বিভাগ। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সচল রাখা এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সিংহভাগ রাজস্ব জোগান দেওয়ার প্রধান দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক চরম আস্থাহীনতার সংকট। দেশের সাধারণ ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও সাধারণ জনগণের মাঝে আজ একটি ধারণা অত্যন্ত সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে, ‘পুরা কাস্টমস ডিপার্টমেন্টই দুর্নীতিবাজ’। কাস্টমসের নাম শুনলেই মানুষের মনে সবার আগে ভেসে ওঠে ‘ঘুষ’ এবং ‘হয়রানি’র ছবি। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে শুরু করে দেশের সর্ববৃহৎ বেনাপোল স্থলবন্দর কিংবা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো—সবখানেই ব্যবসায়ীদের মুখে আজ একই আক্ষেপ। জনগণের এই চরম আস্থাহীনতা কিন্তু একদিনে বা হুট করে তৈরি হয়নি। দশকের পর দশক ধরে চলা প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত লুটপাট, আমলাতান্ত্রিক হয়রানি আর টেবিলের নিচের ওপেন সিক্রেট বাণিজ্যের ফলেই আজ এই বিভাগটি দুর্নীতির একটি অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কাস্টমসের এই দুর্নীতি কোনো একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর একক বা বিচ্ছিন্ন কাজ নয়। এটি উপর থেকে নিচ পর্যন্ত জালের মতো ছড়িয়ে থাকা একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক চেইন বা চক্র। এই চক্রটি মূলত পাঁচটি সুনির্দিষ্ট ধাপে শুল্ক ফাঁকি ও ঘুষের এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। প্রথম ধাপটি হলো এইচএস কোড কারসাজি। পণ্যের আন্তর্জাতিক কোড বা শ্রেণীবিভাগ পরিবর্তনের মাধ্যমে ৩০ শতাংশ শুল্কের পণ্যকে মাত্র ৫ শতাংশ শুল্কের কোডে দেখিয়ে প্রতি কনটেইনার বা চালানে লাখ লাখ টাকা ঘুষের বাণিজ্য চলে। এর ফলে সরকার প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার বৈধ রাজস্ব হারাচ্ছে। দ্বিতীয় ধাপটি হলো আন্ডার ইনভয়েসিং বা পণ্যের মূল্য কম দেখানো। ১০ লাখ টাকার আমদানিকৃত পণ্যের দাম কাগজে মাত্র ৪ লাখ টাকা দেখিয়ে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়, আর কাস্টমস কর্মকর্তারা এই জঘন্য জালিয়াতি ‘না দেখার ভান’ করার জন্য মোটা অঙ্কের কমিশন পকেটে তোলেন। এর ফলে দেশের সৎ ও বৈধ ব্যবসায়ীরা বাজারে টিকে থাকতে পারছেন না।
দুর্নীতির তৃতীয় ধাপটি হলো ফিজিক্যাল ভেরিফিকেশন বা পণ্যের কায়িক পরীক্ষা। ‘মাল খালাস দেব না’ বা ‘চালানে গরমিল আছে’—এমন নানা অজুহাতে দিনের পর দিন কনটেইনার বন্দরে আটকে রাখা হয়। ব্যবসায়ীকে প্রতিদিনের জন্য অতিরিক্ত ডেমারেজ বা জরিমানার ভয় দেখিয়ে আদায় করা হয় ‘স্পিড মানি’ বা ঘুষ। এই বাড়তি খরচের পুরো প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে দেশের সাধারণ ভোক্তার ঘাড়ে, যা নিত্যপণ্যের বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে। চতুর্থ ধাপে রয়েছে লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন বাণিজ্য। সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স কিংবা বন্ড লাইসেন্স ইস্যু করার জন্য ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষের একটি অঘোষিত ‘ফিক্সড রেট’ বা স্থায়ী হার নির্ধারণ করা রয়েছে। যার ফলে নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তারা ব্যবসা-বাণিজ্যে আসার সাহস পাচ্ছেন না। আর পঞ্চম ধাপের প্রত্যক্ষ শিকার হন দেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধা প্রবাসীরা। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে নামার পর বৈধ ও সাধারণ মালামালকেও ট্যাক্স বা শুল্কের ভয় দেখিয়ে লাগেজ প্রতি নির্দিষ্ট হারে টাকা দাবি করা হয়। ফলশ্রুতিতে প্রবাসীরা নিজের দেশে ফিরতেও এক ধরনের মানসিক আতঙ্কে ভোগেন।
সম্প্রতি কাস্টমসের একজন প্রভাবশালী মেম্বার বা সদস্য মান্নান শিকদারের বিরুদ্ধে ওঠা ২০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ, ১২টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং ডুপ্লেক্স বাড়ির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির গভীরতাকেই পুনরুল্লেখ করে। সাধারণ সরকারি বেতন স্কেল অনুযায়ী একজন গ্রেড-২ পদমর্যাদার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মূল বেতন মাত্র ৭৮ হাজার টাকা। এই নির্দিষ্ট আয় দিয়ে ৩০ বছরের চাকরিজীবনে কোনোভাবেই বৈধ উপায়ে ২০ কোটি টাকার মালিক হওয়া বা এক ডজন ফ্ল্যাট কেনা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দুর্নীতি দমন কমিশনের সূত্রগুলো বলছে, মান্নান শিকদারের এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এর আগেও কাস্টমসের বহু কমিশনার, যুগ্ম-কমিশনার ও সহকারী কমিশনারের বিরুদ্ধে এনবিআর ও দুদক মামলা করেছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে শুধুমাত্র এক রাতের ‘ফাইল ম্যানেজ’ বাণিজ্যের পরিমাণই কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
কাস্টমসে এই দুর্নীতির মূল কারণ তিনটি। প্রথমত, ক্ষমতা ও সুযোগের বিপরীতে কঠোর শাস্তির চরম অভাব। একটি ফাইলে সই করা বা আটকে রাখার একচ্ছত্র ক্ষমতা যে কর্মকর্তার হাতে, তার কাছে কোটি টাকার খেলা কোনো ব্যাপারই নয় এবং তাদের মনে ধরা পড়ার কোনো ভয় নেই। দ্বিতীয়ত, এখানে ‘উপরি আয়’ বা ঘুষকে একটি নিয়মিত সংস্কৃতি ও ‘বেতনের অংশ’ হিসেবে মানসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলা হয়েছে। এ কারণেই কাস্টমসের পোস্টিংকে প্রশাসনের ভাষায় ‘লাভজনক পোস্টিং’ বলা হয়। তৃতীয়ত, এখানে কোনো কার্যকর জবাবদিহিতা নেই। কোনো ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী যদি কাস্টমস কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন, তবে শাস্তির বদলে উল্টো ওই ব্যবসায়ীর পরবর্তী চালানের ফাইল কাস্টমসে ৩ মাসেও খালাস হয় না। এই হয়রানির ভয়ে সবাই মুখ বুজে অন্যায় সহ্য করেন।
অনেকে দাবি করেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বাড়িয়ে দিলে বোধহয় দুর্নীতি সমাজ থেকে কমে যাবে। কিন্তু কাস্টমস বিভাগের ক্ষেত্রে এই বহুল আলোচিত তত্ত্বটি সম্পূর্ণ অচল প্রমাণিত হয়েছে। ২০১৫ সালে জাতীয় পে স্কেলে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন যখন প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছিল, তারপরেও আন্তর্জাতিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টে কাস্টমস বিভাগ দেশের শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত ৩টি খাতের একটি হিসেবে বহাল ছিল। বর্তমানে একজন কাস্টমস মেম্বারের সরকারি বেতন ১ লাখ টাকারও বেশি, সাথে রয়েছে দামি গাড়ি, বাড়ি ও চালকের সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সুবিধা। তারপরেও ২০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড় কেন গড়ে ওঠে? কারণ, কাস্টমসে দুর্নীতি এখন আর ‘অভাবের’ কারণে হয় না, এটি পরিণত হয়েছে ‘স্বভাব ও নেশায়’। যার অবৈধ মাসিক আয় ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা, তার কাছে সরকারি মাত্র ২০ বা ৩০ হাজার টাকা বেতন বৃদ্ধি পাওয়াটা অত্যন্ত হাস্যকর ও অর্থহীন।
তাই ব্যক্তি মান্নান শিকদারকে এককভাবে শাস্তির আওতায় আনলে সাময়িক স্বস্তি মিললেও দীর্ঘমেয়াদে কোনো লাভ হবে না। কারণ সমস্যা কোনো ব্যক্তির নয়, সমস্যাটি পুরো সিস্টেম বা ব্যবস্থার। এই ক্যানসার আক্রান্ত অপারেটিং সিস্টেম পাল্টাতে হলে চারটি জরুরি সার্জারি বা কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, শতভাগ অটোমেশন বা ‘ফেসলেস কাস্টমস’ চালু করতে হবে। এইচএস কোড নির্ধারণ ও শুল্কায়নের পুরো প্রক্রিয়াটি মানুষের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ওপর ছেড়ে দিতে হবে। আমদানিকারক নিজেও জানবেন না কোন কম্পিউটার বা কোন কর্মকর্তা তাঁর ফাইল পরীক্ষা করছেন। কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীর সরাসরি দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ হলে ঘুষের রাস্তা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে, যা সিঙ্গাপুর বা ভারত সফলভাবে করে দেখিয়েছে। দ্বিতীয়ত, ক্যাশলেস ও পেপারলেস কাস্টমস গড়ে তুলতে হবে। বন্দরে কোনো ধরনের নগদ অর্থ লেনদেন করা যাবে না, সব ফি অনলাইন এ-চালানের মাধ্যমে জমা হবে। ডিজিটাল ফাইলে ‘টেবিলের নিচে ফাইল আটকে রাখার’ কোনো সুযোগ থাকবে না।
তৃতীয়ত, নিয়মিত কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক রোটেশন বা বদলি এবং কড়া লাইফস্টাইল অডিট চালু করতে হবে। কোনো কর্মকর্তাকে একই বন্দর বা স্টেশনে ২ বছরের বেশি রাখা যাবে না। প্রতি বছর এনবিআর ও দুদকের যৌথ উদ্যোগে কর্মকর্তাদের দৃশ্যমান জীবনযাত্রার সাথে তাদের ট্যাক্স ফাইলের অডিট করতে হবে এবং সম্পদের সামান্য গরমিল পেলেই চাকরিচ্যুতি ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। চতুর্থত, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও শুদ্ধাচার পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে। দুর্নীতি প্রমাণিত হলে শুধু জেল নয়, অপরাধীর চৌদ্দগোষ্ঠীর অবৈধ সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ক্রোক করতে হবে। পাশাপাশি সৎ ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের দ্রুত পদোন্নতি ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দিতে হবে।
কাস্টমস বিভাগ হলো একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক রক্ত তথা রাজস্ব আদায়ের মূল উৎস। এই রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়ায় যদি দুর্নীতির ক্যান্সার স্থায়ীভাবে বাসা বাঁধে, তবে পুরো দেশের অর্থনীতি অচিরেই পঙ্গু হয়ে যাবে। তাই মান্নান শিকদারের বিরুদ্ধে ওঠা ২০ কোটি টাকার অভিযোগ সত্য নাকি মিথ্যা, তা সম্পূর্ণ জনস্বার্থে ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দ্রুত বের করতে হবে। তবে তিক্ত সত্য এটাই যে, কাস্টমস বিভাগের এই প্রাচীন অপারেটিং সিস্টেম ও মানুষের হাত থেকে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলার চূড়ান্ত ক্ষমতা কেড়ে না নেওয়া পর্যন্ত এই ঐতিহ্যবাহী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত করা অসম্ভব।
আকাশজমিন / আরআর