ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সরলো বঙ্গবন্ধুর একক ছবি, যুক্ত হলো জিন্নাহ ও জুলাই অভ্যুত্থান মমেকের ৩য় তলায় শিশু ওয়ার্ডে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিস শিল্পে গ্যাস সরবরাহ মঙ্গলবার থেকেই স্বাভাবিক হওয়ার আশা প্রধানমন্ত্রীর ব্যাংকে কোটি টাকার হিসাব ছাড়াল ১ লাখ ৪১ হাজার কাশফুল শুধু সৌন্দর্য নয়, অনেকের জীবিকাও বটে তাড়াশে গোয়ালঘরের তালা ভেঙে ৮টি গরু চুরি, নিঃস্ব কৃষক পরিবার ডেঙ্গুতে আরও ৮ জনের মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ১৭৩৩ জন ঢাকার দুই সিটিতে জামায়াতের অনানুষ্ঠানিক মেয়র প্রার্থী ঘোষণা চারবার গুলিবিদ্ধ ও তিনবার কারাবরণ: ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আলোচনায় ইশরাক অঙ্গ পাচার চক্রের হাত থেকে ফিরল লোহাগাড়ার রায়হান

বেতন বৃদ্ধি বনাম সিস্টেম সংস্কার—সরকারি দুর্নীতি কমানোর বাস্তব পথ কোনটি?


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ১৬ জুন, ২০২৬ সময় : ৫:০১ পিএম

আব্দুল কাইয়ুম খান, বিশেষ প্রতিনিধি

১১ বছর পর সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি নতুন জাতীয় পে স্কেল বা বেতন কাঠামো ঘোষণা করা এবং বর্তমান বাজারদরের সাথে মিল রেখে বেতন বৃদ্ধি করা জরুরি বলে সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন দেশের মাননীয় অর্থমন্ত্রী জনাব আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাঁর মূল যুক্তি হচ্ছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান ও বেতন বাড়ালে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে দুর্নীতি অনেকাংশে কমে আসবে। অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ, অর্থনীতিবিদ এবং প্রশাসনিক মহলে একটি পুরনো কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক নতুন করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে—আর্থিক নিরাপত্তা কি আসলেই মানুষের সততা নিশ্চিত করতে পারে? প্রশ্ন উঠেছে, কাস্টমস, বিআরটিএ, রাজউক, পাসপোর্ট অফিস, পুলিশ, ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা অধিদপ্তরের মতো যে সকল খাত দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির চক্রে বন্দী, সেখানে কি শুধু সরকারি বেতন বাড়ালেই ঘুষের লেনদেন বন্ধ হবে? নাকি এর জন্য প্রয়োজন গভীর কাঠামোগত ও পদ্ধতিগত সংস্কার?

অনুসন্ধানী তথ্যানুযায়ী, অর্থমন্ত্রীর বেতন বৃদ্ধির এই যুক্তির একটি বাস্তব ও সত্য দিক রয়েছে, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। ২০১৫ সালের অষ্টম পে স্কেল ঘোষণার পর গত ১১ বছরে দেশে মূল্যস্ফীতি আকাশ ছুঁয়েছে। বাজারে যে চালের কেজি ছিল ৩৫ টাকা, তা এখন ৬৫ টাকা ছাড়িয়েছে; ৯০ টাকার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকায়। এর ফলে একজন তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণীর সরকারি কর্মচারীর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে পিয়ন, অফিস সহায়কের মতো নিম্নপদস্থ কর্মী, যাদের মাসিক বেতন মাত্র ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা, তাদের জন্য বর্তমান বাজারে টিকে থাকাই এক বড় যুদ্ধ। এই চরম অভাবের পরিস্থিতিতে অনেক সময় ‘স্পীড মানি’ বা উপরি আয় তাদের জন্য একপ্রকার বাঁচার উপায় হয়ে দাঁড়ায়। বৈশ্বিক গবেষণাও বলে, কর্মীদের ন্যায্য বেতন দিলে প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের মালিকনাবোধ বাড়ে। সিঙ্গাপুর বা হংকংয়ের মতো রাষ্ট্রগুলো একসময় উচ্চ বেতন কাঠামো নিশ্চিত করেই প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত করেছিল।

তবে কাস্টমস বা রাজউকের মতো সংবেদনশীল খাতের দিকে তাকালে এই বেতন বৃদ্ধির তত্ত্বটি আংশিক সত্য এবং বেশ দুর্বল প্রমাণিত হয়। কারণ, দেশের বড় বড় দুর্নীতির ক্ষেত্রগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেখানে দুর্নীতি এখন আর ‘অভাবের’ কোনো বিষয় নয়, বরং এটি একটি লাভজনক ‘নেশা ও পেশায়’ পরিণত হয়েছে। যে কর্মকর্তার মাসিক অবৈধ উপরি আয় ২ থেকে ৫ লাখ টাকা, তাঁর কাছে সরকারি বেতন ১০ বা ২০ হাজার টাকা বৃদ্ধি পাওয়াটা অত্যন্ত হাস্যকর ও অর্থহীন। বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতাও এর বড় প্রমাণ। ২০১৫ সালে যখন সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন এক ধাক্কায় প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছিল, তারপরেও আন্তর্জাতিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বৈশ্বিক দুর্নীতি ধারণা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৫ থেকে আরও পিছিয়ে ১৪৭ নম্বরে চলে গিয়েছিল। অর্থাৎ, বেতন বাড়লেও সামগ্রিক দুর্নীতির কোনো হেরফের হয়নি। এর মূল কারণ হলো, বড় বড় দুর্নীতিগুলো মূলত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বা ‘ডিসিশন মেকিং’ লেভেলে হয়ে থাকে, যেখানে কর্মকর্তাদের মূল বেতন এমনিতেই ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ১২ হাজার টাকার ওপরে। তাঁদের এই অনৈতিকতার মূল চালিকাশক্তি ‘অভাব’ নয়, বরং সীমাহীন ‘লোভ’।

বর্তমানে দেশের বেশ কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি কোনো একক ব্যক্তির অন্যায় নয়, বরং সেটি পুরো ‘সিস্টেম’ বা প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন—ভূমি অফিস ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নামজারি, খাজনা ও দলিল রেজিস্ট্রির প্রতিটি ধাপে টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না। কারণ, এখানে এখনো কাগজের ফাইলের ব্যবহার এবং কর্মকর্তাদের হাতে একক ফাইল আটকে রাখার ক্ষমতা রয়ে গেছে। বিআরটিএ এবং পাসপোর্ট অফিসে ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস ও পাসপোর্ট উত্তোলনের ক্ষেত্রে ‘দালাল ছাড়া কাজ হয় না’—এটি একটি প্রতিষ্ঠিত অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। রাজউক ও কাস্টমসের মতো জায়গায় প্ল্যান পাস, নকশা অনুমোদন ও শুল্কায়নের নামে কোটি কোটি টাকার অবৈধ খেলা চলে। এখানে সরকারি বেতন এক লাখ টাকা হলেও কর্মকর্তাদের অনৈতিক আয় মাসে কয়েক লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। ঠিক একইভাবে পুলিশ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সাধারণ মামলা, জিডি, হাসপাতালের সিট বা পরীক্ষার মতো মৌলিক সেবা পেতেও সাধারণ মানুষকে এক প্রকার লিখিত ‘চুক্তি’ করে টাকা দিতে হয়।

এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের জন্য শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো কোনো টেকসই সমাধান নয়। এর জন্য প্রয়োজন তিনটি ‘সি’ তথা ক্যাশ, কন্ট্রোল ও কনসিকোয়েন্স-এর সমন্বয়ে একটি বাস্তবসম্মত ডিজিটাল সার্জারি। প্রথমত, ‘কন্ট্রোল’ বা সিস্টেম অটোমেশন নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের হাত থেকে ফাইল অনুমোদনের একচ্ছত্র ক্ষমতা কেড়ে নিতে হবে। ভূমি অফিসের অনলাইন কার্যক্রমের আওতায় ই-নামজারি, ই-পর্চা ও ডিজিটাল খাজনা পুরোপুরি চালু হওয়ায় তহশিল অফিসে ইতিমধ্যে ঘুষের সুযোগ কিছুটা কমেছে। দ্বিতীয়ত, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন থেকে এনে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে এনে উভয় দপ্তরের ডেটাবেজ একসাথে লিংক বা সংযুক্ত করতে হবে। এর ফলে জাল দলিল রেজিস্ট্রি চিরতরে বন্ধ হবে।

তৃতীয়ত, দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম বা তাৎক্ষণিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু করতে হবে। প্রতিটি জমির দলিল, নামজারি বা বড় সরকারি টেন্ডারের ডেটা সরাসরি দুদকের সার্ভারে লাইভ বা সরাসরি চলে যাবে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে যেকোনো ‘অস্বাভাবিক লেনদেন’ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত করা হবে। বিআরটিএ-এর সব ধরনের ফি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নেওয়া বাধ্যতামূলক করলে দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে। চতুর্থত, প্রশাসনের সর্বোচ্চ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি সরকারি অফিসে একটি দৃশ্যমান ‘সিটিজেন চার্টার’ ও নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকবে। যদি ৭ দিনের মধ্যে নামজারি না হয়, তবে সংশ্লিষ্ট এসি ল্যান্ডের বেতন কর্তন করা হবে এবং ২১ দিনের মধ্যে পাসপোর্ট না দিলে আঞ্চলিক পরিচালকের বার্ষিক এসিআর বা কার্যদক্ষতা প্রতিবেদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

পরিশেষে বলা যায়, দেশের নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীদের পেটে ভাত না থাকলে তাদের সততা শেখানো সম্ভব নয়। তাই দীর্ঘ ১১ বছর পর কর্মচারীদের অধিকার হিসেবে একটি নতুন ও যৌক্তিক পে স্কেল অবশ্যই দেওয়া উচিত। তবে যারা দুর্নীতিকে তাদের পেশা বানিয়ে ফেলেছেন, তাদের জন্য বেতন কোনো ওষুধ নয়; তাদের জন্য প্রয়োজন কঠোর আইনি সার্জারি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণ পেপারলেস, ক্যাশলেস ও ফেসলেস সেবা মাধ্যমে রূপান্তর করতে হবে, যাতে নাগরিকেরা কর্মকর্তাদের না দেখেই অনলাইনে সব সুযোগ-সুবিধা পান। দুর্নীতি প্রমাণিত হলে চাকরিচ্যুতি এবং অপরাধীর চৌদ্দগোষ্ঠীর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার মতো কঠোর দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। সিস্টেম ঠিক না হলে ভালো মানুষও অসৎ হতে বাধ্য হয়; তাই আগে সিস্টেম সংস্কার হোক, তবেই বেতন বৃদ্ধির সুফল দেশ ও দেশের সাধারণ মানুষ ভোগ করতে পারবে।

উল্লেখ্য, সরকারি বেতন বৃদ্ধি বা পে কমিশন গঠন হলো কি হলো না, তা নিয়ে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো মাথাব্যথা নেই। বিশেষ করে—বিআরটিএ, পাসপোর্ট অফিস, এনবিআর, কাস্টমস, ভ্যাট অফিস, বাংলাদেশ পুলিশ, ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, শিক্ষা অধিদপ্তর এবং রাজউকের (RAJUK) মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর একাংশের অসাধু কর্মকর্তাদের এ নিয়ে কোনো চিন্তা থাকে না। কারণ, তারা অবৈধ উপায়ে প্রতি মাসে অনায়াসে ১০ থেকে ২০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত উপার্জন করেন। তাই মূল বেতন ৫০ হাজার টাকা বাড়লো নাকি কমলো, তা তাদের দৈনন্দিন জীবনে কোনো প্রভাব ফেলে না।

প্রকৃতপক্ষে, এই পে কমিশন বা বেতন বৃদ্ধি কেবল সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্যই একমাত্র ভরসা এবং সোনার হরিণ। সৎ উপায়ে সংসার চালাতে গিয়ে যারা প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছেন, একমাত্র তারাই অধীর আগ্রহে বেতন বৃদ্ধির অপেক্ষায় থাকেন। অন্যদিকে, দুর্নীতিবাজদের জন্য সরকারি বেতন কেবলই একটি নগণ্য সংখ্যামাত্র, তাদের আয়ের মূল উৎস লুকিয়ে থাকে টেবিলের নিচ দিয়ে আসা অবৈধ অর্থেই।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর