দেশে বছরে ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার মেট্রিক টন পাটবীজের চাহিদা থাকলেও এর একটি বড় অংশ অর্থাৎ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন বীজই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আমদানির এই পরনির্ভরতা কমিয়ে উন্নতমানের পাটবীজ উৎপাদনে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে আট দফা বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে কর্মসূচির পরিবর্তে স্থায়ী প্রকল্প গ্রহণ, উন্নত জাতের বীজের উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকদের জন্য প্রণোদনা বাড়ানো এবং কৃষকদের উৎপাদিত বীজ সরকারিভাবে কিনে নেওয়ার গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা দেওয়ার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সম্প্রতি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সভায় এসব নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান। সভায় তিনি বলেন, বাংলাদেশের উৎপাদিত পাটের গুণগত মানের কারণে বিশ্ববাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পাটবীজের গুণগত মান ভালো হলে পাটের আঁশের মানও অনেক ভালো হবে। এই লক্ষ্যে তিনি বাংলাদেশ পাট গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিজেআরআই-কে বীজ উন্নয়নের বিষয়ে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন বা বিএডিসি এবং বাংলাদেশ পাট গবেষণা প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে পাটবীজ উৎপাদনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, জেআরও-৫২৪ জাতের বীজ পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদন করা গেলে দেশে পাটবীজে দ্রুত স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব। এই জাতের জীবনকাল কম হওয়ায় এটি সংগ্রহের পর একই জমিতে আমন ধান চাষ করা যায়, যা কৃষকদের কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য। দেশে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পাটবীজ উৎপাদনের জন্য প্রায় ৬ হাজার ৮০০ হেক্টর জমি প্রয়োজন। তবে উৎপাদিত বীজ সঠিক মূল্যে বিক্রির নিশ্চয়তা না থাকায় অনেক কৃষক পাটবীজ উৎপাদনে আগ্রহ দেখাতেন না। এখন থেকে বীজ কিনে নেওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হলে তাদের আগ্রহ বহুগুণ বাড়বে।
সভায় বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির পাটবীজ উৎপাদনে ব্লক সুপারভাইজারদের কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন। তিনি বীনা-১ ও বিজেআরআই তোষা-৯ জাতকে জনপ্রিয় করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে বীজের সংগ্রহমূল্য বাড়ানো এবং কৃষকদের উৎপাদিত পাটবীজ সরাসরি কিনে নেওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়ার নির্দেশনা দেন তিনি। বিএডিসির কর্মকর্তারা জানান, ধীরে ধীরে সক্ষমতা ও উৎপাদন জোন বাড়ানো গেলে অতিরিক্ত ৩ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন পাটবীজ দেশেই উৎপাদন করা সম্ভব।
বিস্তারিত আলোচনার পর সভায় যে আট দফা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো– কর্মসূচির পরিবর্তে প্রকল্প গ্রহণ, বিজেআরআই উদ্ভাবিত বীনা তোষা-১ ও বিজেআরআই তোষা-০৯ জাতের উৎপাদন সক্ষমতা নিশ্চিত করা, কৃষকদের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, বীজ ক্রয়ের জন্য প্রণোদনা বাবদ বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো, কৃষক পর্যায়ে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী বীজ বিতরণ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মনিটরিং টিম গঠন, পাটবীজ উৎপাদনে ব্লক সুপারভাইজারদের সম্পৃক্ত করা এবং লবণাক্ত, পাহাড়ি ও নদীতীরবর্তী এলাকায় পাটবীজ উৎপাদনের কার্যক্রম গ্রহণ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সমন্বিত উদ্যোগ সফল হলে বাংলাদেশ পাটবীজে পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে।