বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন আন্দোলনের কিংবদন্তি এবং নিটল-নিলয় গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা আহমাদ (৬৬) আর নেই। গত ২১ জুন ব্যাংককের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দেশের নারী অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের এই বাতিঘরের আকস্মিক প্রয়াণে দেশের ব্যবসায়ী মহলসহ সর্বস্তরে গভীর শোক ও বেদনার ছায়া নেমে এসেছে।
সেলিমা আহমাদ ছিলেন একাধারে দূরদর্শী নারীনেত্রী, সফল কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব ও সাবেক সংসদ সদস্য। দেশের নারী সমাজকে ব্যবসার মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে ২০০১ সালে তিনি ‘বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’ (বিডব্লিউসিসিআই) প্রতিষ্ঠা করেন এবং বর্তমান মেয়াদেও সংগঠনটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর অনন্য সাধারণ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এই চেম্বারটি দেশের ৬০ হাজারেরও বেশি প্রান্তিক ও উদীয়মান নারী উদ্যোক্তাকে সরাসরি ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন, বাজার সংযোগ এবং নীতিনির্ধারণী সহায়তা দিয়ে স্বাবলম্বী করে তুলেছে। বাংলাদেশে নারীদের জন্য স্বল্প সুদে ও সম্পূর্ণ জামানতবিহীন ব্যাংক ঋণ সুবিধা চালুর পেছনে মূল কারিগর ছিলেন তিনি। এছাড়া দেশের নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নে ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে পরিচিত প্রথম ‘ওমেন্স ন্যাশনাল বিজনেস অ্যাজেন্ডা’ (ডাব্লিউএনবিএ) প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে তিনি সম্মুখ সার থেকে নেতৃত্ব দেন।
ব্যবসায়িক খাতের বাইরেও জাতীয় ও শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল অনন্য। তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালক হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষানুরাগী এই ব্যক্তিত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (এআইইউবি)-এর ব্যবসায় প্রশাসন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিভাগে (বিবিএ ও ইএমবিএ প্রোগ্রাম) ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দীর্ঘদিন সুনামের সাথে শিক্ষকতা করেছেন।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও সেলিমা আহমাদের বিচরণ ছিল গৌরবময়। তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর উইমেন’ (টিআইএডব্লিউ)-এর গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডর এবং সার্ক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নারী উদ্যোক্তা কাউন্সিলের ভাইস চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি ‘রিজিওনাল নেটওয়ার্ক অব উইমেন বিজনেস অর্গানাইজেশনস’ এবং ‘উইমেনস ডেমোক্রেসি নেটওয়ার্ক (আইআরআই)’-এর বাংলাদেশ শাখার চেয়ার হিসেবে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছিলেন।
অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশ-বিদেশে বহু মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হন। এর মধ্যে ওসলো বিজনেস ফর পিস অ্যাওয়ার্ড (২০১৪), জিন জে. কার্কপ্যাট্রিক অ্যাওয়ার্ড (২০১৩), ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পুরস্কার, প্রিয়দর্শিনী অ্যাওয়ার্ড (২০১২) এবং টিআইএডব্লিউ ওয়ার্ল্ড অব ডিফারেন্স অ্যাওয়ার্ড (২০১০) অন্যতম। ২০২২ সালে জাতীয় অর্থনীতিতে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া তিনি টিআইএডব্লিউ ওয়ার্ল্ড অব ডিফারেন্স লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ডেও সম্মানিত হন। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ‘উইমেন এন্টারপ্রেনিউরস ফাইন্যান্স ইনিশিয়েটিভ (উই-ফাই)’ ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তাঁকে বিশ্বমঞ্চে “লিডারশিপ চ্যাম্পিয়ন” হিসেবে মনোনীত করে।
শিক্ষাজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসা ব্যবস্থাপনায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ডেনমার্ক ও কানাডায় বিভিন্ন উচ্চতর নির্বাহী প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার অন ডেমোক্রেসি, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড দ্য রুল অব ল’ (সিডিডিআরএল)-এর একজন সম্মানিত ফেলো ছিলেন। তাঁর এই দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির অবিচল অঙ্গীকার আগামী প্রজন্মের জন্য আজীবন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, আজ ২৩ জুন বাদ জোহর গুলশান-২ এর আজাদ মসজিদ প্রাঙ্গণে মরহুমার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরপর সাভারের কর্ণপুরে অবস্থিত পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় মর্যাদায় চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে। বিডব্লিউসিসিআই-এর পক্ষ থেকে মরহুমার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে।
আকাশজমিন / আরআর