বিগত ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর রায়ের সময় এজলাসে উপস্থিত ছিলেন।
মামলার একমাত্র আসামি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ সুনির্দিষ্ট মোট আটটি অভিযোগ এনেছিল। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান অভিযোগটি ছিল—গণ-আন্দোলন চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জন বিক্ষোভকারীকে গুলি করে হত্যার সরাসরি নির্দেশ প্রদান এবং সারা দেশে আন্দোলনকারীদের ওপর নৃশংস হামলা চালাতে উসকানি দেওয়া। বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) এই রায় সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। এর মধ্য দিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ষষ্ঠ মামলার রায় ঘোষিত হলো।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ইনুর বিরুদ্ধে এই মামলার তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ এবং একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এরপর ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করার পর উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে গত বছরের ২ নভেম্বর আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। ওই বছরের ৩০ নভেম্বর সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার কাজ শুরু হয় এবং ১ ডিসেম্বর থেকে প্রথম সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষ এই মামলায় মোট ১০ জন সাক্ষী হাজির করে এবং আসামিপক্ষ নিজেদের পক্ষে দুজন সাফাই সাক্ষী পেশ করে। চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া যুক্তিতর্ক উপস্থাপন গত ১৩ মে শেষ হলে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। পরবর্তীতে গত ২২ জুন আদালত আজকের দিনটিকে রায় ঘোষণার জন্য ধার্য করেছিলেন।
আদালতে প্রমাণিত আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ:
প্রথম অভিযোগ: ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতীয় একটি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় আন্দোলনকারীদের ‘জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক’ বলে অ্যাখ্যা দেন ইনু। তিনি তাদের দমনে বল প্রয়োগের উসকানি ও প্ররোচনা দেওয়ার পাশাপাশি হত্যার নির্দেশ দেন।
দ্বিতীয় অভিযোগ: ১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪-দলীয় জোটের সভায় উপস্থিত থেকে আন্দোলনকারীদের ওপর ‘দেখামাত্র গুলি’ (শুট অ্যাট সাইট) করার সিদ্ধান্ত গ্রহণে এবং তা বাস্তবায়নে নির্দেশ ও উসকানি প্রদান করেন।
তৃতীয় অভিযোগ: ছবি দেখে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার একটি তালিকা তৈরি করতে এবং তাঁদের আটক করে নির্যাতন চালানোর জন্য কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে (এসপি) ফোনে নির্দেশ দেন।
চতুর্থ অভিযোগ: গণ-আন্দোলন দমাতে মারণাস্ত্রের ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ছত্রীসেনা নামিয়ে আকাশ থেকে বোমা হামলার (বম্বিং) সুপরিকল্পিত নীল নকশা তৈরি করার অভিযোগ।
পঞ্চম অভিযোগ: বিভিন্ন গণমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে তৎকালীন সরকারের হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন-নিপীড়নকে কৌশলে সমর্থন দেওয়া।
ষষ্ঠ অভিযোগ: ১৪-দলীয় জোটের নীতি নির্ধারণী সভায় উপস্থিত থেকে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
সপ্তম অভিযোগ: শেখ হাসিনার সঙ্গে নিয়মিত টেলিফোনে কথা বলে আন্দোলন দমানোর নানা ষড়যন্ত্রে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকা।
অষ্টম অভিযোগ: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে ইউসুফ শেখ, উসামা, সুরুজ আলী বাবু, আশরাফুল ইসলাম, বাবলু ফরাজী ও আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন নামের ছয় আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতাকে হত্যা করার চূড়ান্ত নির্দেশনা প্রদান। একই সাথে সারা দেশে ১ হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যা এবং ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষকে আহত করার পেছনে প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ।