সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটি ইতিমধ্যে পে কমিশনের দেওয়া সুপারিশগুলো অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেছে। বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্য প্রণীত পৃথক তিনটি পে কমিশনের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বা রোড ম্যাপ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ রোড ম্যাপটি চলতি সপ্তাহের মধ্যেই অর্থ মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ নথিপত্র এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশগুলো অনুমোদনের জন্য দ্রুতই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সবুজ সংকেত বা চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পরপরই আগামী জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে এ সংক্রান্ত একটি সরকারি গেজেট প্রকাশের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখবে অর্থ বিভাগ।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের কৌশল নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে একাধিক প্রস্তাব নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। শুরুতে তিন বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনার কথা চিন্তা করা হলেও কারিগরি জটিলতা এড়াতে শেষ পর্যন্ত দুই ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তটিই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সরকারি সমন্বিত হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি বা ‘আইবিএএসপ্লাস’ সফটওয়্যারে যাতে কোনো ধরনের কারিগরি জটিলতা সৃষ্টি না হয়, সেজন্য একবারে পুরো মূল বেতন কার্যকর করার পক্ষে জোরালো যুক্তি দেখিয়েছে অর্থ বিভাগ। তবে সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি দুই ধাপে সম্পন্ন করার দিকেই এখন বেশি মনোযোগ দিচ্ছে উচ্চপর্যায়ের কমিটি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারের বর্তমান ২০টি গ্রেডের মধ্যে ১ থেকে ১০ নম্বর গ্রেডের কর্মচারীদের শতভাগ বা তার কাছাকাছি বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে, অপেক্ষাকৃত নিম্ন আয়ের বা ১১ থেকে ২০ নম্বর গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রায় ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ানোর একটি বড় প্রস্তাবনা সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করার ঐতিহাসিক মুহূর্তে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরকারি কর্মচারীদের জন্য এই নতুন বেতনকাঠামো চালুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছিলেন। বাজেটে এই পে-স্কেল কার্যক্রমের প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল অঙ্কের তহবিল বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো রূপরেখা না দিলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই ৪৪ হাজার কোটি টাকা মূলত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেনশনভোগী এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন সমন্বয়ের পেছনে ব্যয় করা হবে। নেট পাবলিক সার্ভিস বা সরকারি সেবা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে এই বিশাল বাজেটের সংস্থান করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি। নবম পে কমিশনের মূল সুপারিশ অনুযায়ী, মূল বেতনে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বড় ধরনের বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর আগে সবশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়িত হয়েছিল, যা দুই ধাপে কার্যকর করা হয়। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই এবারও দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের বেতনকাঠামো পুনর্বিন্যাসের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে সরকার প্রায় ১৪ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর বেতন-ভাতা বাবদ বছরে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে থাকে। নতুন এই পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে সরকারের ব্যয়ের পরিমাণ স্বাভাবিকভাবেই আরও অনেক বৃদ্ধি পাবে, যা একই সাথে সরকারি সেবামূলক কাজের মানোন্নয়নেও অত্যন্ত ইতিবাচক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।