ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সরলো বঙ্গবন্ধুর একক ছবি, যুক্ত হলো জিন্নাহ ও জুলাই অভ্যুত্থান মমেকের ৩য় তলায় শিশু ওয়ার্ডে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিস শিল্পে গ্যাস সরবরাহ মঙ্গলবার থেকেই স্বাভাবিক হওয়ার আশা প্রধানমন্ত্রীর ব্যাংকে কোটি টাকার হিসাব ছাড়াল ১ লাখ ৪১ হাজার কাশফুল শুধু সৌন্দর্য নয়, অনেকের জীবিকাও বটে তাড়াশে গোয়ালঘরের তালা ভেঙে ৮টি গরু চুরি, নিঃস্ব কৃষক পরিবার ডেঙ্গুতে আরও ৮ জনের মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ১৭৩৩ জন ঢাকার দুই সিটিতে জামায়াতের অনানুষ্ঠানিক মেয়র প্রার্থী ঘোষণা চারবার গুলিবিদ্ধ ও তিনবার কারাবরণ: ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আলোচনায় ইশরাক অঙ্গ পাচার চক্রের হাত থেকে ফিরল লোহাগাড়ার রায়হান

মাঠহীন ১৫ হাজার স্কুল

চার দেওয়ালে বন্দি শৈশব, বাড়ছে ডিভাইস আসক্তি


সারাদেশে মাঠহীন ১৫ হাজার স্কুল

  • আপলোড সময় : বুধবার ০১ জুলাই, ২০২৬ সময় : ৮:৪৯ পিএম

স্টাফ রিপোর্টার 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট নীতিমালায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ থাকা বাধ্যতামূলক করা হলেও বাস্তবে তা কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। ঢাকাসহ সারা দেশে ১৫ হাজারেরও বেশি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক সরকারি-বেসরকারি বিদ্যালয়ে কোনো খেলার মাঠ নেই। এর ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। খোলা মাঠের অভাবে শিশুরা ক্রমেই ঘরের কোণে বন্দি হয়ে পড়ছে এবং দিনের একটি বড় অংশ ডিজিটাল ডিভাইসের স্ক্রিনে কাটিয়ে মারাত্মক আসক্তিতে ভুগছে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকার বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আজিজুল হকের দুই সন্তান—১১ বছর বয়সি ছোটটি এবং ১৩ বছর বয়সি বড়টি স্থানীয় একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। বড় সন্তানের কাছে দীর্ঘক্ষণ স্মার্টফোনে বুঁদ হয়ে থাকার কারণ জানতে চাইলে সে জানায়, তার খেলার তীব্র ইচ্ছা থাকলেও আশপাশে কোনো মাঠ নেই। এমনকি ছোট সন্তানকে মোহাম্মদপুর থানাটি কোন জেলায় অবস্থিত জিজ্ঞেস করা হলে, সে নিজের মেধা খাটানোর চেয়ে ফোন হাতে নিয়ে গুগলে সার্চ করে উত্তর দেয়। আজিজুল হক জানান, সন্তানদের স্কুলের পাশাপাশি তাদের বাসার কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেও কোনো খেলার মাঠ নেই। একই চিত্র দেখা গেছে মিরপুরের কাজীপাড়ার বাসিন্দা রবিউল আলমের ৯ বছর বয়সি শিশুর ক্ষেত্রেও। খেলার মাঠ না পেয়ে সে বেশির ভাগ সময় মোবাইল, ট্যাব ও স্মার্ট টিভিতে ব্যস্ত থাকে। দুপুরের দিকে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল এখন তার কী করা উচিত, তখন সে জানায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চ্যাটবট ‘চ্যাটজিপিটি’র কাছে জেনে সে উত্তর দেবে। এই পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দেয় যে, মাঠের অভাব শিশুদের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও শারীরিক সক্রিয়তা কেড়ে নিচ্ছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকায় সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ৫ হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে ৯৫ শতাংশের বেশি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত। এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯৮ শতাংশেরই নিজস্ব কোনো খেলার মাঠ নেই। অনেক স্কুল গড়ে উঠেছে গ্যারেজ, ছাদ কিংবা ছোট কোনো ভবনের অবরুদ্ধ পরিসরে। দেশের সব বিভাগীয় শহরের প্রায় ৪০ শতাংশ বেসরকারি স্কুলেও মাঠের কোনো অস্তিত্ব নেই। অন্যদিকে, দেশের ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেকের বেশি এবং ৭২ দশমিক ২৬ শতাংশ ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থীরা উন্মুক্ত মাঠের সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। শুধু বেসরকারি নয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, খোদ রাজধানীতে থাকা ৩৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৫cell২টিতেই কোনো খেলার মাঠ নেই।

শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষার্থীদের সুস্থ দেহ ও সুস্থ মন নিশ্চিত করতে খেলাধুলা ও সহশিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। প্রতিটি বিদ্যালয়ে সমাবেশ আয়োজন, উন্মুক্ত খেলাধুলা ও শ্রেণিকক্ষের বাইরে পাঠদানের জন্য একটি সুন্দর মাঠ থাকা জরুরি। মাঠ ছাড়া কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় না। মাঠের এই তীব্র সংকটের কারণে শিশুরা ঘরের মধ্যে ভিডিও গেম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মগ্ন থাকছে, যা তাদের সৃজনশীলতা ও মেধার বিকাশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। ঢাকার বহু মা-বাবা এখন তাদের সন্তানদের এমন অবরুদ্ধ ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

যদিও ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ, ক্রীড়া ও শরীরচর্চার ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এমনকি বর্তমান সরকার দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠ সংরক্ষণ এবং তা আশপাশের শিশু-কিশোরদের জন্য উন্মুক্ত রাখার নির্দেশ দিয়েছে। গত ২৫ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, স্কুল ছুটির পর এবং সরকারি ছুটির দিনগুলোতে মাঠগুলো স্থানীয় শিশুদের খেলার জন্য খুলে দিতে হবে। এটি শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য একটি অপরিহার্য শর্ত। তবে এই নির্দেশনা যারা অমান্য করছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না। সরেজমিনে মাঠ থাকা পাঁচটি স্কুলে গিয়ে দেখা গেছে, বিকাল হতেই স্কুলের মূল ফটক ও মাঠ তালাবদ্ধ করে রাখা হয়।

খেলার মাঠের এই ঘাটতির সুযোগে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে ফাস্টফুড ও রেস্তোরাঁ। মাঠ না থাকায় শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে এসব রেস্তোরাঁয় অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে এবং আড্ডা দিয়ে সময় পার করছে। অনেক সময় এসব দোকানে শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষতিকর তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি ও প্রচার করা হয়, যা শিক্ষাঙ্গনের ১০০ মিটারের মধ্যে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইন অমান্য করে এই তামাকের বিস্তার কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।

এমনকি রাজধানীতে যে কয়েকটি উন্মুক্ত মাঠ রয়েছে, সেগুলোও দেখভালের অভাবে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। আসাদ গেটের পশ্চিমে অবস্থিত লালমাটিয়া নিউ কলোনি ক্রীড়া চক্র মাঠটি দীর্ঘকাল ধরে অবৈধ দখল ও দূষণের শিকার। মাঠটিতে এখন কোনো ঘাস নেই; বরং এর চারপাশ কাঁচাবাজার, ভ্রাম্যমাণ দোকান ও ভবন নির্মাণসামগ্রীর ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। অবৈধ মেলা এবং গাড়ি বিক্রির হাট বসার কারণে স্থানীয় শিশুরা নিজেদের খেলার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতিজন মানুষের সুস্থতার জন্য অন্তত ৯ বর্গমিটার খোলা জায়গা বা পার্ক প্রয়োজন। অথচ ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় জনপ্রতি খোলা জায়গার পরিমাণ এক বর্গমিটারের চেয়েও কম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক শিক্ষার্থীর গবেষণা থেকে জানা যায়, খোলা জায়গার এই সংকট সবচেয়ে প্রকট পুরান ঢাকায়, যার আটটি ওয়ার্ডে কোনো উন্মুক্ত স্থানই অবশিষ্ট নেই।

এই সংকট নিরসনে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, দেশের প্রায় ৬৬ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের উন্নয়নে বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। একই সাথে, নতুন কোনো বেসরকারি বিদ্যালয়ের অনুমোদনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মানের খেলার মাঠ থাকা বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে কাজ চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আবদুল হালিম বলেন, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উন্মুক্ত মাঠ ও খেলাধুলার সুযোগ থাকা অত্যাবশ্যক এবং এ বিষয়ে সরকারের দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) সাম্প্রতিক এক গবেষণা অনুযায়ী, একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত শহরে প্রতি আধা বর্গকিলোমিটার এলাকায় একটি করে খেলার মাঠ থাকা আবশ্যক। সেই হিসেবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৩০৫ দশমিক ৪৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের জন্য অন্তত ৬১০টি মাঠ প্রয়োজন। অথচ বাস্তবে আছে মাত্র ২৩৫টি, যা প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার স্কুলপড়ুয়া শিশুরা মোবাইল, টেলিভিশন, ট্যাব বা কম্পিউটারের স্ক্রিনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় কাটায়। এর ফলে তাদের পর্যাপ্ত ঘুম হচ্ছে না, ওজন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মাথাব্যথা ও চোখের সমস্যাসহ নানা মানসিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

বিদ্যালয়ে মাঠ না থাকার বাস্তব উদাহরণ ২০ বছর বয়সি তরুণ আদনান হোসেন। রাজধানীর একটি বেসরকারি স্কুল থেকে এসএসসি পাস করা আদনানের ১০ বছরের বিদ্যালয় জীবন কেটেছে কেবল চার দেওয়ালের চারকোণায়। প্রতিদিন সকালে পড়াশোনা দিয়ে শুরু হয়ে বিকালে বাসায় ফিরে আবারও কেবল পড়ার টেবিলে বসা—এটাই ছিল তার রুটিন। খেলাধুলায় তার সমবয়সি অন্যান্যদের থানা, জেলা বা জাতীয় পর্যায়ের নানা পুরস্কার ও অর্জনের ঝুলি সমৃদ্ধ হলেও আদনানের ঝুলিতে কিছুই নেই। খেলার মাঠহীন অবরুদ্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কারণে আদনানের মতো দেশের লাখো শিক্ষার্থীর শৈশব ও কৈশোরের সোনালি দিনগুলো এভাবেই মলিন ও আনন্দহীন হয়ে পড়েছে।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর