বাংলা একাডেমির সভাপতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই। আজ রোববার (৫ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর মিরপুরে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে এই প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিকের বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। গুণী এই অধ্যাপকের আকস্মিক প্রয়াণে দেশের শিক্ষাঙ্গন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুর বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং তাঁরই স্নেহধন্য ছাত্র মোহাম্মদ আজম। তিনি বলেন, ‘বেলা আড়াইটা থেকে তিনটার মধ্যে মিরপুর-১ নম্বরের একটি রেস্তোরাঁয় স্যার দুপুরের খাবার খেতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। যতদূর জেনেছি, তাঁকে মিরপুরের হার্ট ফাউন্ডেশনে নেওয়া হয়েছিল। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।’ চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।
বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের জন্ম ১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার পাকুন্দিয়া গ্রামে। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অসম্ভব মেধাবী। শিক্ষাজীবন শেষে কর্মজীবনে এসে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগ দেন এবং সেখানে দীর্ঘদিন অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সুনামের সাথে অধ্যাপনা করেছেন। তাঁর মেধা, প্রজ্ঞা ও সাবলীল পাঠদান পদ্ধতি সমাজ ও মানুষ গঠনে অনন্য অবদান রেখেছে। তাঁর অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী আজ দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক কেবল একজন শিক্ষকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক ও প্রগতিশীল চিন্তাবিদ। স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার আন্দোলনে তিনি আজীবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। ভাষা ও সাহিত্যের সেবায় তিনি আমৃত্যু নিবেদিত ছিলেন। ‘সুন্দরম’ ও ‘লোকায়ত’ নামে দুটি উচ্চমানের সাহিত্য ও সমাজবিষয়ক সাময়িকপত্রের সম্পাদনা করে তিনি দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে সমৃদ্ধ করেছেন।
সাময়িকপত্র সম্পাদনা ছাড়াও মৌলিক সাহিত্য ও প্রবন্ধ শাখায় রয়েছে তাঁর অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও কালজয়ী বই। ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন’, ‘রাজনীতি দর্শন’, ‘সাহিত্য চিন্তা’, ‘সংস্কৃতির সহজ কথা’-এর মতো ২০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে গুণী এই অধ্যাপকের। এছাড়া তাঁর সুযোগ্য সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘স্বদেশচিন্তা’-এর মতো একাধিক ঐতিহাসিক ও সমাদৃত গ্রন্থ। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও প্রবন্ধ গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮১ সালে তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষ সম্মাননা ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’ লাভ করেছিলেন। তাঁর এই মহাপ্রয়াণ বাংলাদেশের মননশীল সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে এক অপূরণীয় ক্ষতি।