আব্দুল কাইয়ুম খান, বিশেষ প্রতিনিধি
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউক যেন এখন অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা আর ঘুষ বাণিজ্যের একচ্ছত্র চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অভিযোগ, এই রাষ্ট্রীয় সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসেছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদন থেকে শুরু করে সরকারি প্লট বরাদ্দ—প্রতিটি টেবিলে টেবিলে এখন চলছে প্রকাশ্য টাকার খেলা। রাজউকের অলিগলিতে কান পাতলেই শোনা যায় কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের গুঞ্জন। পরিস্থিতি এখন এমন এক অবাস্তব ও নজিরবিহীন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, এই প্রতিষ্ঠানের একজন সাধারণ নিরাপত্তা কর্মী বা সিকিউরিটি গার্ডও এখন শতকোটি টাকার বিপুল সম্পদের অলিখিত মালিক বনে গেছেন। অথচ চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই বিশাল আর্থিক অনিয়ম আর ক্ষমতার অপব্যবহার দেখেও রাজউকের শীর্ষ প্রশাসন সম্পূর্ণ নির্বিকার ও উদাসীন ভূমিকা পালন করছে। মাঠ পর্যায়ের এই পুকুরচুরি আড়াল করতে বা আইনি ফাঁকফোকর গলাতে রাজউকের আইন বিভাগের যে তৎপরতা থাকার কথা ছিল, সেখানেও দেখা গেছে চরম ব্যর্থতা ও পেশাদারিত্বের অভাব। আইন বিভাগের এই নজিরবিহীন দেউলিয়াত্ব ও উদাসীনতা সামগ্রিকভাবে পুরো প্রতিষ্ঠানটিকে এক গভীর খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ নগরবাসীকে।
যদি আমরা রাজউকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জীবনযাত্রার দিকে তাকাই, তবে দেখা যাবে এক জাদুকরী পরিবর্তনের গল্প। রূপকথার প্রবাদের মতো আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন এখানকার শত শত চাকুরিজীবী। অনুসন্ধানে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, রাজউকের আওতাধীন পূর্বাচল, উত্তরা বা ঝিলমিলসহ বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পের প্লট বণ্টন প্রক্রিয়ায় চলে চরম জালিয়াতি। এছাড়া রাজধানীর বহুতল বাণিজ্যিক বা আবাসিক ভবনের নকশা অনুমোদন, কাজ শুরুর জন্য নির্মাণ অনুমতিপত্র প্রদান এবং নামমাত্র উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে রাজউকে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী, দুর্ভেদ্য সিন্ডিকেট। এই অসাধু চক্রের হাত ধরে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন এমন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। তাদের সরকারি বেতন স্কেল বা বৈধ আয়ের সাথে বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়ের কোনো ধরনের যৌক্তিক মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। ঢাকার অভিজাত এলাকাগুলোতে তাদের নামে-বেনামে আলিশান বাড়ি, দামি গাড়ি আর বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের ছড়াছড়ি।
এই পুরো দুর্নীতির মহাসমুদ্রে সবচেয়ে চমকপ্রদ, চাঞ্চল্যকর এবং টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হওয়া অভিযোগটি উঠেছে সিকিউরিটি গার্ড আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে। রাজউকের একজন সামান্য নিরাপত্তা কর্মী হয়েও তিনি যেভাবে বিপুল পরিমাণ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, তা যেকোনো রূপকথাকেও হার মানায়। বিভিন্ন গোপন ও প্রকাশ্য সূত্রে প্রাপ্ত নথিপত্র এবং তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, আব্দুল মালেকের নামে রাজধানী ঢাকা এবং এর আশেপাশের উপশহরগুলোতে অন্তত ১০ কোটি টাকা বাজারমূল্যের বিলাসবহুল বহুতল বাড়ি, একাধিক আধুনিক ফ্ল্যাট এবং অত্যন্ত মূল্যবান বাণিজ্যিক প্লট রয়েছে। একজন সাধারণ চতুর্থ শ্রেণীর চাকুরিজীবীর সীমিত বেতন-ভাতা এবং সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কীভাবে এই আকাশচুম্বী রাজকীয় সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব, তা নিয়ে সাধারণ ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগী নাগরিক সমাজ অবিলম্বে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে এই কোটিপতি নিরাপত্তা কর্মীর আয়ের উৎস অনুসন্ধান এবং তাকে কঠোর আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, প্রতিষ্ঠানজুড়ে দুর্নীতির এমন ভয়াবহ ও লজ্জাজনক চিত্র প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলেও রাজউকের সর্বোচ্চ পদধারী কর্মকর্তা অর্থাৎ চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রতিরোধমূলক বা শাস্তিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। শীর্ষ মহলের এই রহস্যজনক নীরবতা এবং কঠোর পদক্ষেপহীনতাকে রাজউকের ভেতরের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট একটি সবুজ সংকেত বা অভয়বাণী হিসেবে ধরে নিয়েছে। এর ফলে রাজউকের প্রতিটি দপ্তরে ঘুষের লেনদেন এবং ফাইলের স্থবিরতা দিন দিন আরও বেশি বেপরোয়া ও ওপেন সিক্রেটে পরিণত হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের সাধারণ মানুষ যখন একটি নকশা পাসের জন্য মাসের পর মাস রাজউকের বারান্দায় জুতো ক্ষয় করছেন, তখন টেবিলের তলা দিয়ে টাকা দিলেই সেই ফাইল মুহূর্তের মধ্যে ছাড় পেয়ে যাচ্ছে।
প্রশাসনিক এই চরম ব্যর্থতার পাশাপাশি রাজউকের আইন বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক দেউলিয়াত্ব ও অযোগ্যতাও এখন চরম আকারে প্রকাশ পেয়েছে, যা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য প্রশাসনিক নথিতে দেখা যায়, ২০২৩ সাল থেকে শুরু করে আজ অবধী দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল মামলার জন্য যোগ্য, দক্ষ এবং সঠিক কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ল অফিসার নিয়োগ করতে পারেনি এই আইন বিভাগ। শুধু তাই নয়, মহামান্য হাইকোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থগিতাদেশ বা স্থিতি আদেশ আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে প্রত্যাহার বা ভাঙাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে এই দপ্তর। বছরের পর বছর ধরে চলা আইনি প্রক্রিয়ার এই চরম স্থবিরতা এবং অপেশাদারিত্বের কারণে রাজউকের একাধিক বড় বড় জনগুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নমূলক ও সেবামূলক কার্যক্রম সম্পূর্ণ থমকে গেছে। এর ফলে একদিকে যেমন সরকারের উন্নয়ন বাজেট অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের চোখেও রাজউকের প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি ও বিশ্বস্ততা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
দেশের বিশিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজউকের বর্তমান এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দেশের বিদ্যমান প্রচলিত আইনের চরম লঙ্ঘন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ২০০৪ সালের দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের স্পষ্ট ২৭ ধারা অনুযায়ী, যেকোনো সরকারি চাকুরিজীবী বা পাবলিক সার্ভেন্টের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত, অসংগতিপূর্ণ বা আয়ের উৎসের সাথে অমিল রয়েছে এমন সম্পদ অর্জন করা একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। এর জন্য কঠোর কারাদণ্ড ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের বিধান রয়েছে। এছাড়া দেশের দণ্ডবিধির ১৬১ ও ১৬৫ ধারা মোতাবেক, সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে যেকোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা, উপহার বা ঘুষ গ্রহণ করা স্পষ্ট ও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য। একই সাথে, মহামান্য হাইকোর্টের কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা বা আদেশ বাস্তবায়নে ইচ্ছাকৃত গড়িমসি, অবহেলা কিংবা আইনি গাফিলতি সরাসরি আদালত অবমাননা বা কনটেম্পট অব কোর্টের শামিল, যা রাজউকের আইন বিভাগ প্রতিনিয়ত করে চলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বর্তমান এই পচনশীল এবং জনবিচ্ছিন্ন অবস্থা থেকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউককে টেনে তুলতে হলে এবং এর হারিয়ে যাওয়া গৌরব ও জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে অবিলম্বে কিছু অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। প্রথমত, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদকের মাধ্যমে রাজউকের প্রথম শ্রেণী থেকে শুরু করে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সম্পদের সঠিক ও নিরপেক্ষ বিবরণী জরুরি ভিত্তিতে তলব করতে হবে। বিশেষ করে, শূন্য থেকে হিরো বনে যাওয়া বিতর্কিত নিরাপত্তা কর্মী আব্দুল মালেকের ১০ কোটি টাকার এই বিশাল অবৈধ সম্পদের প্রকৃত উৎস এবং এর পেছনে রাজউকের কোন কোন বড় কর্মকর্তা জড়িত তা খোঁজার জন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, রাজউক চেয়ারম্যানকে তার আইনি ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ সঠিক প্রয়োগ ঘটিয়ে অবিলম্বে একটি অভ্যন্তরীণ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে এবং প্রাথমিক তদন্তে দোষী প্রমাণিতদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, রাজউকের পুরো আইন বিভাগকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। সেখানে দলীয় বা তদবিরের ভিত্তিতে নয়, বরং মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে অভিজ্ঞ আইনজীবী এবং দক্ষ আইনি কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হবে, যেন মহামান্য হাইকোর্টের যেকোনো স্থগিতাদেশ দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়। সর্বোপরি, প্লট বরাদ্দ, লটারি, নকশা অনুমোদন এবং ফি জমাদানের পুরো প্রক্রিয়াটিকে শতভাগ অনলাইন ও সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্রযুক্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। রাজউকের সেবা যদি মানুষের হাতের মুঠোয় চলে আসে, তবে সাধারণ মানুষ সরাসরি দালাল চক্র এবং ভেতরের অসাধু কর্মকর্তাদের খপ্পর থেকে রেহাই পাবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।
যে প্রতিষ্ঠানের ওপর তিলোত্তমা ঢাকা নগরীর সুপরিকল্পিত, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করার মূল রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব অর্পিত, সেই রাজউক নিজেই যদি আজ দুর্নীতির আখড়া ও ঘুষের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়, তবে সাধারণ নাগরিকেরা আশ্রয়ের জন্য আর কোথায় দাঁড়াবে? একজন সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের ১০ কোটি টাকার রাজকীয় সম্পদের মালিক হওয়ার অবিশ্বাস্য ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, এই প্রতিষ্ঠানের ভেতরের ক্ষতের গভীরতা আসলে কতটা ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী। রাজউকের এই চরম প্রাতিষ্ঠানিক পতন, নৈতিক অবক্ষয় এবং জনহয়রানি ঠেকাতে এখন আর কোনো লুকোচুরি বা ধামাচাপা দেওয়ার সংস্কৃতির সুযোগ নেই। বরং রাজধানী ঢাকাকে বাঁচাতে এবং সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা করতে দুর্নীতি দমন কমিশন এবং সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী মহলের সরাসরি, কঠোর ও আপসহীন হস্তক্ষেপ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। রাজউককে এই মাফিয়াতন্ত্র ও সিন্ডিকেটের হাত থেকে মুক্ত করতে না পারলে একটি পরিকল্পিত নগরীর স্বপ্ন চিরকাল স্বপ্নই থেকে যাবে।
আকাশজমিন / আরআর