দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আবারও ধেয়ে আসছে বন্যার বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়। মৌসুমী বায়ুর সক্রিয় প্রভাবে টানা ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত এবং সীমান্ত পার হয়ে উজান থেকে নেমে আসা তীব্র পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রায় সবকটি প্রধান নদ-নদীর পানি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নদীগুলোর পানি বৃদ্ধির এই ধারা যদি আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, তবে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করবে। এর ফলে দেশের লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলগুলোতে এক সপ্তাহের মধ্যে আকস্মিক বা স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দেওয়ার চরম আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নদী তীরবর্তী লাখো মানুষের মনে এখন নতুন করে প্লাবিত হওয়ার আতঙ্ক বিরাজ করছে।
আজ রোববার (১৯ জুলাই ২০২৬) বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পক্ষ থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ বন্যা পরিস্থিতি ও মধ্যমেয়াদি পূর্বাভাস প্রতিবেদনে এই উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। সংস্থাটির দেওয়া নিয়মিত বুলেটিনে দেশের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির দিনভিত্তিক যে চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত সতর্কতামূলক। পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে অতিবৃষ্টির কারণে প্রতি বছরই এই সময়ে বাংলাদেশের নদ-নদীতে পানির চাপ অস্বাভাবিক বেড়ে যায়, যার ব্যতিক্রম এবারও ঘটছে না।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম প্রধান নদী কুশিয়ারা নদীর পানি ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট) ও মারকুলি (সুনামগঞ্জ) স্টেশনে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এই পয়েন্টগুলোতে পানির উচ্চতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় আশপাশের চরাঞ্চল ও গ্রামীণ রাস্তাঘাট ইতোমধ্যে পানির নিচে তলিয়ে গেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদদের দেওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী দুই দিন দেশের রংপুর ও সিলেট বিভাগ এবং একই সাথে ভারতের আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারতের এই পাহাড়ি অঞ্চলের বৃষ্টির পানি সরাসরি বাংলাদেশের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে এসে আছড়ে পড়ে। এর প্রভাবে আগামী তিন দিন এই সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি আরও ব্যাপক হারে বাড়তে পারে।
বাপাউবো জানিয়েছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নদী দুটির আরও কিছু নতুন স্থানে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে নতুন করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে অথবা চলমান বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়ে একই অবস্থায় স্থিতিশীল থাকতে পারে। নতুন করে পানি বাড়লে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ার পাশাপাশি ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য বড় নদীগুলোর পরিস্থিতিও খুব একটা সন্তোষজনক নয়। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের অন্যতম প্রধান নদ ব্রহ্মপুত্র নদের পানি কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় থাকলেও, যমুনা নদীর পানি কিন্তু প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। নদী বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ দিন এই পানি বৃদ্ধির ধারা একইভাবে অব্যাহত থাকতে পারে, যা নিম্নাঞ্চলের জন্য একটি বড় বিপদের সংকেত। বিশেষ করে ২০ থেকে ২৪ জুলাইয়ের মধ্যে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলার কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি সর্বোচ্চ সতর্ক সীমায় পৌঁছাতে পারে। এর প্রভাবে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও নতুন করে গ্রামীণ জনপদ প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা চরাঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রবাহিত সারিগোয়াইন, যাদুকাটা ও কংস নদীর পানি এই মুহূর্তে কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। তবে আশঙ্কার কথা হলো, এই অঞ্চলের সোমেশ্বরী ও ভুগাই নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে অনেক বেড়ে গেছে। আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, আগামী তিন দিনে এসব পাহাড়ি নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। যার ফলে আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নেত্রকোণা জেলার সোমেশ্বরী নদীর কিছু নির্দিষ্ট স্থানে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। আর তা যদি সত্যি হয়, তবে নেত্রকোণা জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। আকস্মিক এই ঢলে ঘরবাড়ি প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পড়তে পারেন স্থানীয় খামারিরা।
এ ছাড়া দেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য ছোট-বড় নদীগুলোর পানি পরিস্থিতিরও ধারাবাহিক অবনতি হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আপার করতোয়া, আপার আত্রাই, টাঙ্গন, পুনর্ভবা, মহানন্দা ও যমুনেশ্বরী নদীর পানি গত কয়েক দিনের বৃষ্টির ফলে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আগামী তিন দিন এসব নদীর পানিও আরও অনেক বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে বলে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। নদীগুলোর অববাহিকায় পানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় ভাঙন আতঙ্কেও দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। নদী তীরবর্তী বাঁধগুলোর ওপর কড়া নজরদারি রাখার পাশাপাশি দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার জন্য আগাম প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। তবে ভারতের আসাম ও মেঘালয় অঞ্চলের বৃষ্টিপাত যদি দ্রুত না কমে, তাহলে এই স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিতে পারে, যা দেশের সার্বিক কৃষি খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের বন্যা পরিস্থিতির ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।