একসময় নিয়ন্ত্রণে চলে আসা সংক্রামক ব্যাধি হাম নতুন করে দেশে ভয়াবহ আকারে দেখা দেওয়ায় মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসে বাংলাদেশে ৪২ হাজার ১৭৪ জন শিশু ও ব্যক্তি হাম এবং এর নানা উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, একই সময়ে বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এত বিপুলসংখ্যক হাম আক্রান্তের ঘটনা ঘটেনি। সংস্থাটির সদর দফতর থেকে প্রকাশ করা নজরদারি প্রতিবেদনের সুনির্দিষ্ট উপাত্ত পর্যালোচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) বিশ্বজুড়ে সংক্রমণের এই আশঙ্কাজনক চিত্র তুলে ধরেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১৭৪টি দেশের তথ্য নিয়ে তৈরি এই প্রতিবেদনে জানা যায়, উল্লেখিত ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে মোট ১ লাখ ৮৬ হাজার রোগী সনাক্ত হয়েছেন, যার মধ্যে সিংহভাগই দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার দেশগুলোতে কেন্দ্রীভূত। বৈশ্বিক তালিকার দ্বিতীয় স্থানে থাকা ভারতে ২৬ হাজার ৬০৭ জন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে ১৪ হাজার ৫২১ জন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছেন। পরবর্তী স্থানগুলোতে যথাক্রমে মেক্সিকো, পাকিস্তান, ক্যামেরুন, কাজাখস্তান, গুয়েতেমালা, অ্যাঙ্গোলা এবং সুদান রয়েছে। যেখানে আগের বছরগুলোতে বাংলাদেশে রোগী শনাক্তের সংখ্যা ছিল খুবই কম—যেমন ২০২৫ সালে মাত্র ১৩২ জন, ২০২৪ সালে ২৪৭ জন এবং ২০২৩ সালে ২৮২ জন—সেখানে এ বছর রোগীর সংখ্যা হঠাৎ লাফিয়ে শীর্ষে পৌঁছে যাওয়া দেশের চিকিৎসকদের দারুণ চিন্তায় ফেলেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৪৮ জনে দাঁড়িয়েছে, যার মধ্যে ল্যাব পরীক্ষায় ১৪ হাজার ৭০৮ জনের দেহে হামের উপস্থিতি শতভাগ নিশ্চিত হওয়া গেছে। একই সময়ে হাম এবং এর আনুষঙ্গিক জটিলতা নিয়ে প্রায় ৭৯৭ জন শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, বাংলাদেশে এবার শুধু সংক্রমণের দিক থেকেই শীর্ষস্থান দখল করেনি, বরং মৃত্যুহার বিবেচনা করলেও দেশটি সম্ভবত বৈশ্বিক তালিকায় শীর্ষে থাকবে।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মার্চ মাসে আক্রান্তের সংখ্যা পাঁচ হাজারে পৌঁছালেও এপ্রিল মাসে তা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং মে মাসেও প্রায় ১৫ হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। আক্রান্তদের বড় একটি অংশই কোমলমতি শিশু। আক্রান্তদের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এক বছরের কম বয়সী প্রায় পাঁচ হাজার আক্রান্ত শিশুর চার হাজারের বেশি কোনো টিকাই পায়নি। একইভাবে ১ থেকে ৪ বছর এবং ৫ থেকে ৯ বছর বয়সী আক্রান্ত শিশুদের অর্ধেকেরও বেশি টিকার কোনো ডোজ নেয়নি। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুদের ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা যায়, ভর্তি হওয়া শতকরা ৮০ ভাগ শিশু ছিল অনাক্রান্ত ও টিকাহীন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত টিকাদানের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়া এবং প্রয়োজনীয় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) ঘাটতিই এই বিপুল প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ। অতীতে ২০০৬, ২০১০ কিংবা ২০১৪ সালে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে টিকাদানের কাভারেজ ১০০ শতাংশ বা তার বেশি হলেও ২০২০ সালের পর বিশেষ কোনো ফলোআপ ক্যাম্পেইন আয়োজিত হয়নি। ওপরন্তু, ২০২৫ সালে পূর্ববর্তী অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে টিকা ক্রয়ের প্রচলিত প্রক্রিয়া পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের কারণে ভ্যাকসিনের তীব্র সংকট দেখা দেয়। এ বিষয়ে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর পক্ষ থেকে আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে চিঠি পাঠানো হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি।
সংক্রমণ কমানোর উদ্দেশ্যে সম্প্রতি সরকারের পরিচালিত বিশেষ টিকা অভিযানেও লক্ষ্যের চেয়ে প্রায় ৪৬ লাখ শিশু বাদ পড়ে যায়। ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে লক্ষ্য ধরে টিকাদান সাজানো হলেও মূলত জুনের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইনে দেখা যায় এই বয়সী শিশুর সংখ্যা ২ কোটি ২৬ লাখের মতো। আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান সতর্ক করে জানান, টিকাদানের এই ঘাটতির ফলে যে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে, তা রাতারাতি দূর হবে না এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করে ভ্যাকসিনের আওতায় না আনলে সামনে আরও বড় ধরণের স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা থেকে যাবে।