গুরুতর শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণ দেখিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। শুক্রবার বিকেল সাড়ে চারটায় জাতীয় সংসদের স্পিকারের উদ্দেশ্যে লেখা পদত্যাগপত্রে তিনি স্বাক্ষর করেন এবং তা আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেন। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর সংবলিত এই পদত্যাগপত্রটি ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে পৌঁছানোর বিষয়টি সুনিশ্চিত করা হয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ভবন বঙ্গভবনের দায়িত্বশীল সূত্রসমূহ থেকে সরাসরি এই ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটির সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
স্পিকারের কাছে প্রেরিত বিশেষ পদত্যাগপত্রে বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর শরীর ও স্বাস্থ্যের বর্তমান পরিস্থিতি বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। পদত্যাগপত্রে তিনি স্পষ্ট ভাষায় নিজের শারীরিক নানা ধরনের জটিল অসুস্থতার কথা গভীরভাবে উল্লেখ করেন। তিনি প্রকাশ করেন যে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মক হৃদরোগ, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং কিডনিজনিত নানান গুরুতর জটিলতাসহ বহুবিধ শারীরিক অসুস্থতা ও স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন।
অসুস্থতার বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে তিনি পদত্যাগপত্রে পূর্বে তাঁর হৃদযন্ত্রে ওপেন হার্ট বাইপাস সার্জারি সম্পন্ন হওয়ার জরুরি বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেন। এর পাশাপাশি তিনি জানান, সম্প্রতি আধুনিক চিকিৎসা ও শারীরিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁর দেহে ‘অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি’ (Autonomic Neuropathy) নামক জটিল ও বিরল রোগ শনাক্ত করা হয়েছে। এই বিশেষ স্নায়বিক রোগের মারাত্মক প্রভাবে তিনি বেশ কিছু দিন ধরে মাঝেমধ্যেই হঠাৎ করে কিছু সময়ের জন্য সংজ্ঞাহীন বা অচেতন হয়ে পড়েন, যা সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
জাতীয় সংসদের স্পিকারের নিকট দেওয়া পদত্যাগপত্রে রাষ্ট্র প্রধান মো. সাহাবুদ্দিন আরও উল্লেখ করেছেন, এসব বিভিন্ন জটিল ব্যাধির আক্রমণাত্মক প্রাদুর্ভাব এবং শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যের কারণে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা এখন আর তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। চিকিৎসকদের পরামর্শক্রমে তাঁর এখন দ্রুত নিবিড় ও দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার চরম প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দেশের মহান সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের স্পষ্ট বিধান অনুযায়ী তিনি স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান করছেন।
রাষ্ট্রপতির এই হঠাৎ পদত্যাগের খবর প্রকাশের পরপরই উদ্ভূত দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিস্থিতির বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে বিকেল পাঁচটার পর এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনের আহ্বান করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। উক্ত সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া ও পদত্যাগপত্র সংক্রান্ত সকল বিষয়ের বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক বিবরণ আনুষ্ঠানিকভাবে জাতির সামনে তুলে ধরা হবে।
এদিকে বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোর নিয়ম অনুসারে, সংবিধানের চতুর্থ ভাগের ১ম পরিচ্ছেদের ৫৪ নম্বর অনুচ্ছেদে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যদি কোনো কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয় কিংবা পদত্যাগ, অনুপস্থিতি অথবা গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কারণে রাষ্ট্র প্রধান নিজ দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি অসমর্থ হন, তবে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাষ্ট্রের সমস্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন পরিচালনা করবেন। সেই অনুযায়ী দেশের সাংবিধানিক প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ সংক্রান্ত পরবর্তী কার্যক্রম নির্ধারিত নিয়ম মেনে ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হবে।