ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

আজ বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস

দেশে হেপাটাইটিসে বছরে ২০ হাজার মৃত্যু, আক্রান্ত প্রায় ১ কোটি


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ২৮ জুলাই, ২০২৬ সময় : ১০:২৫ এএম

আজ বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। বর্তমান বিশ্বে ভাইরাল হেপাটাইটিস এখনো অন্যতম বড় ও মারাত্মক জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। অত্যন্ত আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, আমাদের বাংলাদেশে প্রতি বছর হেপাটাইটিস সংক্রান্ত নানা জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় ২০ হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি এবং হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত বলে বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন। হেপাটাইটিসজনিত কারণে মৃত্যুর সামগ্রিক হারের দিক থেকে বিশ্বজুড়ে শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান রয়েছে, যা আমাদের স্বাস্থ্য খাতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।

বাংলাদেশে লিভার সিরোসিস এবং মারাত্মক লিভার ক্যানসারের মূল কারণ হিসেবে হেপাটাইটিস বি ও হেপাটাইটিস সি ভাইরাসকেই প্রধানত দায়ী বলে মনে করা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আমাদের দেশে গড়ে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের নেপথ্যে রয়েছে মারাত্মক হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের প্রত্যক্ষ সংক্রমণ। এই পরিস্থিতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিস পুরোপুরি নির্মূল করার বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অবিলম্বে জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক সর্বজনীন স্ক্রিনিং কর্মসূচি বা বিশেষ পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের সর্বস্তরের মানুষকে পরীক্ষার আওতায় এনে প্রয়োজনীয় টিকা ও আধুনিক চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করা আবশ্যক। এছাড়া সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুততম সময়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত চিকিৎসার পরিধি বিস্তৃত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের সম্মানীয় প্রতিষ্ঠাতা এবং দেশের খ্যাতিমান লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জন অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন যে, প্রতিবছর আমাদের দেশে প্রায় ২০ হাজার নিরপরাধ মানুষ কেবল এই রোগের সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুবরণ করছেন। তারা বর্তমানে যাকাত ফান্ডের অর্থায়নে থ্যালাসেমিয়ার রোগী ও দুস্থ দরিদ্র মানুষদের নিয়মিত চিকিৎসা সুবিধা দিয়ে যাচ্ছেন। হেপাটাইটিসের প্রয়োজনীয় ওষুধ ও প্রতিরোধক টিকা সাধারণ মানুষের চিকিৎসায় সহজে পাওয়ার সুপারিশ জানিয়ে তিনি বলেন, অনেক আক্রান্ত রোগী চিকিৎসার মারাত্মক ব্যয়ভার বহন করতে না পেরে মাঝপথে হারিয়ে যান। পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, এই হারিয়ে যাওয়ার মূল কারণ হলো চিকিৎসা ব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়া।

তিনি আরও প্রস্তাব করেন যে, ইপিআই শিডিউলে জন্মকালীন প্রথম ডোজ বা বার্থডোজ দ্রুত সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ গ্রাম এলাকায় বসবাস করেন। অথচ গ্রামের অধিকাংশ মানুষের হেপাটাইটিস বি ও সি সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা বা প্রয়োজনীয় জ্ঞান নেই বললেই চলে। যার ফলে তৃণমূলের এই বিশাল বিপুল জনগোষ্ঠী এতদিন ধরে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও আধুনিক চিকিৎসার বাইরে রয়ে গেছেন। বর্তমানে আমাদের দেশে হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসের সামগ্রিক চিকিৎসা অত্যন্ত শহরকেন্দ্রিক এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাব্যবস্থা কেবল হাতে গোনা কয়েকটি প্রধান কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে, যা সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষের নাগালের বাইরে অবস্থান করছে।

বিশ্ব জুড়ে ভাইরাল হেপাটাইটিস প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রদত্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে হেপাটাইটিস বি এবং হেপাটাইটিস সি ভাইরাসজনিত লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ১০ লাখেরও বেশি মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটছে। অথচ সঠিক সময়ে সচেতন হলে এই দুটি মারাত্মক রোগই সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধ করা সম্ভব এবং এগুলো সম্পূর্ণ চিকিৎসাযোগ্য।

ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে দেখা যায়, হেপাটাইটিস বি ভাইরাস এবং এর প্রতিরোধক টিকার উদ্ভাবক নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী অধ্যাপক বারুচ এস. ব্লামবার্গের স্মরণীয় জন্মদিনকে চিরস্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যে ২০১০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতি বছরের ২৮ জুলাই তারিখটিকে ‘বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমাদের দেশেও প্রতি বছর নিয়মিতভাবে এই দিবসটি যথাযথ গুরুত্ব ও মর্যাদার সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে। এ বছর বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের নির্ধারিত মূল প্রতিপাদ্য বিষয় বা স্লোগান হলো— ‘হেপাটাইটিস: আসুন বাধা ভেঙে এগিয়ে যাই’।

গুরুত্বপূর্ণ এই দিবসটি উদযাপন উপলক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের জনগণের উদ্দেশে বিশেষ বাণী প্রদান করেছেন। তিনি তাঁর বাণীতে উল্লেখ করেন যে, সরকারের পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন প্রশাসনিক অঞ্চলে লিভার সংক্রান্ত জটিল রোগের বিশেষায়িত উন্নত চিকিৎসা, অত্যাধুনিক উপায়ে রোগ নির্ণয় সুবিধা এবং চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণের কাজ পুরোদমে চালানো হচ্ছে। এর পাশাপাশি লিভার সিরোসিস ও ক্যানসারে আক্রান্ত অসহায় রোগীদের আর্থিক সাহায্য নিশ্চিত করতে এককালীন সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত সরকারি অনুদান ও সহায়তা প্রদান ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে। রোগীদের সার্বিক সুরক্ষায় চিকিৎসাকেন্দ্রিক আধুনিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর ও যুগোপযোগী করতে সরকার ‘ই-হেলথ কার্ড’ এবং একটি সমন্বিত বিশ্বস্ত রোগী তথ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ দ্রুত গ্রহণ করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, সমগ্র বিশ্বে বর্তমানে গড়ে প্রতি ৩০ সেকেন্ডে অন্তত একজন হেপাটাইটিসে আক্রান্ত মারাত্মক রোগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। দীর্ঘদিন ধরে অসচেতনভাবে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত থাকার ফলেই সাধারণ মানুষ পরবর্তীতে জটিল লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের রূপ নিয়ে মৃত্যুর মুখে ধাবিত হন। অন্যদিকে আমাদের বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্যানসারে মৃত্যুর যে তালিকা রয়েছে, তার মধ্যে তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছে ভয়াবহ লিভার ক্যানসার।

চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, হেপাটাইটিস এ এবং হেপাটাইটিস ই সাধারণত দূষিত পানি, পচা বা খোলা খাবার ও মানুষের মলের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে থাকে। যা কেবল ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জীবাণুমুক্ত বিশুদ্ধ খাবার এবং পানীয় গ্রহণের ব্যাপারে সচেতন হলেই সহজে বিস্তার রোধ করা যায়। কিন্তু বিপরীতপক্ষে, হেপাটাইটিস বি ও হেপাটাইটিস সি মূলত আক্রান্ত গর্ভবতী মা থেকে তাঁর জন্ম নেওয়া শিশুর শরীরে, অসচেতনভাবে অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে এবং অরক্ষিত যৌন সম্পর্কের কারণে একজন থেকে অন্যজনের শরীরে সংক্রমিত হতে পারে। তাই সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে একযোগে সমন্বিত পদক্ষেপ, দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রদান, দেশের গণমাধ্যমগুলোতে ব্যাপকভাবে সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন প্রচার এবং একদম গ্রাম বা কমিউনিটি পর্যায়ে জোরদার টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা গেলে এই হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত সহজ হবে।

এই বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগের সম্মানিত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি প্রকাশ করেছেন যে, জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক (এনআইডি) বিশেষ স্ক্রিনিং কর্মসূচি অবিলম্বে চালু করে দেশের প্রতিটি নাগরিককে পরীক্ষার আওতায় আনা প্রয়োজন। পরীক্ষা শেষে যারা সংক্রমণমুক্ত হিসেবে প্রমাণিত হবেন, তাঁদের সবাইকে দ্রুত সরকারিভাবে প্রতিরোধক টিকার আওতায় আনা গেলে ২০৩০ সালের নির্দিষ্ট বৈশ্বিক সময়সীমার আগেই আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ হেপাটাইটিসমুক্ত একটি সুস্থ ও সুন্দর দেশ হিসেবে গড়ে তোলা পুরোদমে সম্ভব।


এ সম্পর্কিত আরো খবর