ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

বোমা পাওয়ার পরও নিরাপত্তায় ঢিলেমি, ব্যাগ-বস্তা নিয়েই মেট্রোরেলে যাত্রীরা


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ১২:৪৮ এএম

স্টাফ রিপোর্টার 

রাজধানীর সর্বাধুনিক ও নিরাপদ গণপরিবহন মেট্রোরেলের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি মতিঝিল স্টেশনের নিচে শক্তিশালী আইইডি (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) বোমার উপস্থিতি এবং পরবর্তীতে মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট স্টেশনে পরিত্যক্ত বস্তাকে ঘিরে সৃষ্ট বোমাতঙ্কের পর সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে গভীর আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার কথা থাকলেও মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের তরফে যাত্রী-নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ কোনো কার্যকর উদ্যোগ বা বাড়তি তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। উল্টো দেখা গেছে, বিভিন্ন স্টেশনে বড় বড় ব্যাগ, চাল বা মালামালের বস্তা নিয়ে যাত্রীরা নির্বিঘ্নে প্রবেশ করছেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রবেশপথে আনসার বা পুলিশ সদস্য থাকলেও কোনো ব্যাগ বা মালামাল তল্লাশি করা হচ্ছে না।

সরেজমিনে গত সোমবার (৩ আগস্ট) ফার্মগেট, আগারগাঁও ও মিরপুর-১০ মেট্রোরেল স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, প্রতিদিনের মতো বিপুলসংখ্যক যাত্রী কাঁধে, হাতে কিংবা ট্রলিতে করে বড় বড় ট্রাভেল ব্যাগ ও বস্তা নিয়ে অনায়াসে স্টেশনে প্রবেশ করছেন। প্রবেশপথে আনসার সদস্য এবং এমআরটি (মাস র‍্যাপিড ট্রানজিট) পুলিশ দায়িত্ব পালন করলেও তারা কোনো ধরনের মেটাল ডিটেক্টর বা হাত দিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছেন না। এ বিষয়ে দায়িত্বরত কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মীর সঙ্গে কথা বলা হলে তারা জানান, সন্দেহজনক মনে না হলে তারা কাউকে সাধারণত তল্লাশি করেন না। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন, যার ফলে প্রত্যেকের ব্যাগ আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে গেলে স্টেশনে দীর্ঘ লাইন তৈরি হবে এবং যাত্রীদের মারাত্মক ভোগান্তি পোহাতে হবে। তাদের মতে, বিমানবন্দরের মতো আধুনিক প্রযুক্তি, স্ক্যানিং মেশিন এবং প্রয়োজনীয় জনবল থাকলে শতভাগ তল্লাশি নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে।

নিরাপত্তাকর্মীরা বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক কাজ করছে। মেট্রোরেলে নিয়মিত যাতায়াতকারী মিরপুরের বাসিন্দা মো. সেলিম উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, ঢাকার এই প্রধান গণপরিবহনে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। মতিঝিলে বোমা পাওয়ার পর অন্যান্য স্টেশনেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় যাত্রীরা সবসময় আতঙ্কে থাকেন কারণ যদি সত্যি কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটে, তবে হাজার হাজার মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়বে। তাই সরকারের উচিত বিষয়টি হালকাভাবে না দেখে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। অন্য এক নিয়মিত নারী যাত্রী তুলি আক্তার জানান, সাম্প্রতিক ঘটনার পর থেকে মেট্রোরেলের গতিও স্বাভাবিকের চেয়ে কমে গেছে বলে মনে হচ্ছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কেবল দ্রুত যাতায়াতের সুবিধা দিয়ে কোনো লাভ নেই।

মেট্রোরেলের নিরাপত্তার এমন ভঙ্গুর চিত্র নিশ্চিত করেছেন পুলিশ কর্মকর্তারাও। ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনের এমআরটি পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মুশফিকুর রহমান জানান, স্টেশনে সন্দেহভাজন কাউকে দেখলে কেবল তল্লাশি করা হয়। হাত দিয়ে পরীক্ষা করার সাধারণ হ্যান্ড ডিটেক্টর ছাড়া সেখানে কোনো ধরনের আর্চওয়ে বা আধুনিক স্ক্যানিং প্রযুক্তি নেই। ফলে নিয়মিত চেক করা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে, সচিবালয় মেট্রো স্টেশনের দায়িত্বে থাকা এমআরটি পুলিশের আরেক কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক ঘটনার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক হয়েছে এবং নির্দেশ এসেছে সন্দেহভাজন কিছু দেখলে তল্লাশি চালানোর। তবে তিনি স্বীকার করেন, সেখানে নিরাপত্তার জন্য যেসব আর্চওয়ে ও স্ক্যানার মেশিন আগে বসানো হয়েছিল, তার কয়েকটি নিষ্ক্রিয় বা অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং সেগুলো নতুন করে সেটআপের কাজ চলছে।

এদিকে, নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি স্টেশনের সিসিটিভি কাভারেজ নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। সম্প্রতি ফার্মগেট স্টেশনে ব্যাগ ফেলে রাখার ঘটনায় সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল কি না জানতে চাইলে স্টেশন কন্ট্রোলার উজ্জ্বল আলী জানান, যেখানে সন্দেহজনক ব্যাগটি রাখা হয়েছিল সেখানে সরাসরি কোনো সিসি ক্যামেরা ছিল না। তবে সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামার পথসহ উপরের ও নিচের তলায় ক্যামেরা বসানো আছে। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, স্টেশনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সরাসরি মনিটর করে এমআরটি পুলিশ ও আনসার সদস্য, যা তাদের কাজ নয়।


সম্প্রতি উদ্ধার হওয়া এসব আইইডির নেপথ্য উৎস নিয়ে তদন্ত চলছে। পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক জানান, ফার্মগেট ও মিরপুরের ঘটনায় ব্যাগ বা বস্তায় কোনো বিস্ফোরক উপাদান পাওয়া যায়নি। ফার্মগেটের বস্তায় ছিল ময়লা আবর্জনা এবং মিরপুর-১০ এ পাওয়া গেছে সাধারণ কিছু বস্তু। ফলে মতিঝিলের উদ্ধার হওয়া আইইডির সাথে এই ঘটনাগুলোর আপাত কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। তবুও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে কারা বারবার এমন আতঙ্ক সৃষ্টি করছে তা চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।

উল্লেখ্য, গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি ছাতার ভেতর থেকে প্রায় ১.৫ কেজি ওজনের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এবং টাইমিং নিয়ন্ত্রিত একটি বোমা (আইইডি) উদ্ধার করে ডিএমপির বোম ডিসপোজাল ইউনিট। পরে তা নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করা হয়, যেখানে এক পথচারী আহত হন। এর মাত্র ৬ দিন পর, ৩০ জুলাই রাতে আশুলিয়ার একটি মুদি দোকানে ট্রাভেল ব্যাগে প্রেসার কুকারে তৈরি আরও একটি টাইমারযুক্ত আইইডি উদ্ধার করা হয়। পর পরপর দুটি জায়গায় শক্তিশালী বোমা উদ্ধারের পর ১ আগস্ট ফার্মগেট ও মিরপুর স্টেশনে পরিত্যক্ত ব্যাগ থেকে ছড়ানো বোমাতঙ্ক ঢাকার পুরো মেট্রোরেল ব্যবস্থাকেই চরম সিকিউরিটি ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়েছে, যার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।


এ সম্পর্কিত আরো খবর