ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

রক্তের আখরে লেখা বিপ্লব

ঐতিহাসিক ৫ আগস্টে ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন বাংলাদেশ


  • আপলোড সময় : বুধবার ০৫ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ৪:০৬ পিএম

দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের জগদ্দল পাথরসম ফ্যাসিবাদী শাসনের চিরঅবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিশ্ব মানচিত্রে এক নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল। সেদিন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে চরম মাহেন্দ্রক্ষণের খবর—জনরোষের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়েছেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সামরিক প্রধানের ভাষণ এবং স্তব্ধ ইন্টারনেট পুনরায় সচল হওয়ার সাথে সাথে রাজপথে আছড়ে পড়ে লাখো জনতার বাঁধভাঙা উল্লাস। যে রাজনৈতিক স্বৈরাচারকে সরাতে দীর্ঘকাল ব্যর্থ হয়েছিল বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো, ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থান তা নিমেষেই ধূলিসাৎ করে দেয়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের এই ঐতিহাসিক চূড়ান্ত মুহূর্তকে জনগণ নাম দেয় ‘৩৬ জুলাই’, যা চিরতরে বদলে দেয় জাতীয় রাজনীতির গতিপথ।

তবে এই অবিস্মরণীয় পরিবর্তন রাতারাতি অর্জিত হয়নি; বরং এর পেছনে পুঞ্জীভূত ছিল বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অন্যায়, দুর্নীতি, সীমাহীন ভোটাধিকার হরণ এবং নজিরবিহীন মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভীষিকা। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন, ২০১৮ সালের রাতের ভোট এবং ২০২৪ সালের প্রহসনমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে শাসনক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে আওয়ামী লীগ। রাজনৈতিক বিরোধীদের গুম, খুন ও কারাগারে নিক্ষেপ করে দীর্ঘ সময় ভয় ও নিপীড়নের রাজত্ব তৈরি করা হয়। একদিকে মেগা প্রকল্পের আড়ালে চরম অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্নীতি, অন্যদিকে তরুণদের বেকারত্ব সমাজে এক তীব্র অসন্তোষের বারুদ জমা করেছিল, যার বিস্ফোরণ ঘটেছিল ২০২৪ সালের জুনে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূচনার মাধ্যমে।

প্রাথমিকভাবে আদালত কর্তৃক সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের আদেশের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ শুরু করেন। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বিতর্কিত বক্তব্য এবং রাজপথে শিক্ষার্থীদের ওপর ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বর্বরোচিত সশস্ত্র হামলা পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ করে তোলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে হকিস্টিক, পাইপ ও পিস্তল নিয়ে সাধারণ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হলে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে ক্যাম্পাসের আন্দোলন রূপান্তরিত হয় সর্বস্তরের জনমানুষের ঐতিহাসিক প্রতিরোধে।

শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও তাণ্ডবের প্রতিবাদে অভিভাবক, শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক ও শ্রমিকসহ আপামর সমাজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসে। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে চরম কঠোর পথ বেছে নেয় তৎকালীন প্রশাসন। সারা দেশে জারি করা হয় কড়া কারফিউ, নামানো হয় সামরিক বাহিনী এবং একই সাথে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয় মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পরিষেবা। কিন্তু ডিজিটালি স্তব্ধ করেও ক্ষুব্ধ জনস্রোতকে আর ঘরে আটকে রাখা সম্ভব হয়নি; বরং যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মুখেই দেশের কোণে কোণে মানুষ বিকল্প উপায়ে বার্তা আদান-প্রদান করে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলে।


পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেন যে, এই গণঅভ্যুত্থান ছিল সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত ও গণমুখী। তৎকালীন সরকার জনসাধারণের এই স্বাভাবিক প্রতিবাদের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হয়ে একে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে দমনের অশুভ নীতি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সহিংসতা ও রক্তপাতের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ৩ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ঐতিহাসিক ‘এক দফা’ অর্থাৎ সরকারের পদত্যাগের চরমপত্র ঘোষণা করেন, যা পুরো জাতিকে এক পতাকার নিচে নিয়ে আসে।

ঐতিহাসিক ৩ আগস্টের অভূতপূর্ব জনসমাবেশ ও সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের আহ্বানের পর শুরু হয় চূড়ান্ত কর্মসূচি ‘মার্চ ফর ঢাকা’। হাজারো প্রতিবন্ধকতা, গণপরিবহন বন্ধ এবং রাজপথের নানা ব্যারিকেড উপেক্ষা করে ৫ আগস্ট ভোরের আলো ফোটার আগেই চারপাশের জেলাগুলো থেকে লাখ লাখ মানুষের ঢল রাজধানী অভিমুখে নামতে থাকে। উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, রামপুরা ও শাহবাগ এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব রক্তচক্ষু ও বাধা ভেদ করে অকুতোভয় ছাত্র-জনতা জাতীয় সংসদ ভবন ও গণভবনের দিকে অগ্রসর হতে থাকলে নিশ্চিত পতন উপলব্ধি করে ক্ষমতা ছেড়ে বিশেষ বিমানে চেপে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা।

ভারতে সাময়িকভাবে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ব্যাপক চর্চা হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্বৈরাচারী শাসকদের পালানোর ঘটনার সাথে বিশ্ব গণমাধ্যম এ ঘটনাকে তুলনা করে। ৫ আগস্টের পর গণভবন ও সংসদ ভবনে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে উদযাপিত হয় জয়ের গৌরব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদরা মনে করেন, এই আন্দোলন শুধু একজন ব্যক্তির পতন ঘটায়নি, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কার ও গণতান্ত্রিক অধিকার পুনর্বহালের জন্য এক নতুন রাজনৈতিক ভিত্তি প্রস্তুত করেছে। রক্তক্ষয়ী এই বিপ্লব ভবিষ্যতে যে কোনো শাসকের জন্য সতর্কবার্তাই পৌঁছে দেয় যে, জনআকাঙ্ক্ষা পদদলিত করে কোনো শাসনই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।


এ সম্পর্কিত আরো খবর