গত ১৬ বছরের শাসনামলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, রাজনৈতিক হয়রানি এবং গায়েবি মামলার মাধ্যমে লাখো মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি দাবি করেন, ওই সময়ে বিরোধী মত দমনের উদ্দেশ্যে ব্যাপক হারে মামলা, গ্রেপ্তার এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটেছে, যার প্রভাব এখনো বহু পরিবার বহন করছে।
বুধবার (৫ আগস্ট) বিকেলে জাতীয় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় আয়োজিত এক আবৃত্তি উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, গত ১৬ বছরের শাসনামলে 'ক্রসফায়ার' নামে সাড়ে চার হাজারেরও বেশি মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে বলে বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। একই সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে ৬০ লাখেরও বেশি মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দায়ের করা হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার কারণে অসংখ্য মানুষ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এসব ঘটনার কারণে বহু পরিবার আজও মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে জীবনযাপন করছে।
তিনি আরও বলেন, গুমের শিকার হওয়া ৭০০ জনেরও বেশি মানুষের পরিবারের সদস্যরা এখনো তাদের স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আশায় দিন গুনছেন। অনেক পরিবার প্রতিদিন প্রার্থনা করছেন, একদিন হয়তো তাদের হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জন ফিরে আসবেন। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য একটি বেদনাদায়ক বাস্তবতা।
আইনমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। অতীতে যেসব ঘটনায় মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে, সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার কাজ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলার সংস্কৃতি কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একটি মানবিক ও আইনের শাসনভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে এসব অনিয়মের পুনরাবৃত্তি রোধ করা জরুরি।
বক্তব্যে তিনি শিল্প-সংস্কৃতির প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, আবৃত্তিকে দীর্ঘদিন ধরে শিল্পচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এর প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছিল না।
তিনি জানান, এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই সংশোধনের মাধ্যমে আবৃত্তিকে নাচ ও গানের মতো বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির একটি স্বীকৃত শাখা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, আবৃত্তি শুধু সাহিত্যচর্চার একটি মাধ্যম নয়; এটি ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মুক্তচিন্তার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নতুন প্রজন্মকে ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখতে আবৃত্তিচর্চার প্রসার অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরও বলেন, দেশের শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশে সরকার ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে এবং ভবিষ্যতেও এ খাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত থাকবে। শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ একটি জাতির মূল্যবোধ, মানবিকতা ও সৃজনশীল চেতনাকে সমৃদ্ধ করে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আবৃত্তি সংগঠনগুলোর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে আইনমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে দিতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। এতে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পাবে।
অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মসহ বাংলাদেশ আবৃত্তি ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন। তারা আবৃত্তিচর্চার প্রসার, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার এবং নতুন প্রজন্মকে সংস্কৃতিমুখী করে তোলার বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় করেন।