অনলাইন রিপোর্টার:
দেশে হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। যেকোনো সময় ৭ থেকে ৯ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে রাজধানী ঢাকা। ঘনবসতিপূর্ণ ও অপরিকল্পিত এই নগরীর বহু এলাকায় উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতেই হিমশিম খেতে পারে, এমনকি কোথাও কোথাও উদ্ধার অভিযান চালানোই প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।
এই শঙ্কাকে সামনে রেখে আগাম প্রস্তুতি জোরদার করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। সম্ভাব্য বড় ধরনের ভূমিকম্পের পর দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে রাজধানীর অন্তত ৪০টির বেশি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সংরক্ষণ করা হয়েছে বিশেষায়িত উদ্ধার সরঞ্জাম। একই সঙ্গে এলাকাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল। সাক্ষাৎকারে তিনি ফায়ার সার্ভিসের চলমান আধুনিকায়ন কার্যক্রম, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির সংযোজন, রেসকিউ হেলিকপ্টার যুক্ত করার পরিকল্পনা, জরুরি সেবা ‘১০২’ চালুর উদ্যোগ, উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধির নানা পদক্ষেপ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার নানা দিক তুলে ধরেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে আসা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মহাপরিচালক জানান, প্রধান লক্ষ্য ছিল ফায়ার সার্ভিসের ওপর জনগণের আস্থা সুদৃঢ় করা এবং সেবাগুলোকে দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর করা। পাশাপাশি নিয়োগ ও বদলি সংক্রান্ত বিষয়ে অতীতে যে নেতিবাচক ধারণা ছিল, তা থেকে দ্রুত উত্তরণ ঘটানো হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ফায়ার লাইসেন্স ও ফায়ার সেফটি প্ল্যানসহ যাবতীয় সেবা অনলাইনে নিয়ে আসা হয়েছে। নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে। অপারেশনাল কাজে শহীদ হওয়া ফায়ার ফাইটারদের পরিবারের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে এবং দায়িত্বরত অবস্থায় কোনো সদস্য মারা গেলে তার সন্তানদের পড়াশোনা নিশ্চিতে এইচএসসি পর্যন্ত শিক্ষা অনুদান চালু করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ভূমিকম্পের মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ উদ্ধারকারী দল (স্পেশাল রেসকিউ টিম) গঠন করা হয়েছে। কেমিক্যাল সংক্রান্ত দুর্ঘটনা মোকাবিলায় প্রথমবারের মতো মিরপুর-১০ নম্বরে একটি বিশেষ ‘কেমিক্যাল ইউনিট’ গঠন করা হয়েছে। মিরপুর-১০-এ ভূমিকম্প-সহনশীল সদর দপ্তর নির্মাণের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে এবং ঢাকায় প্রায় ৮৮টি পরিবারের জন্য উন্নত আবাসন সুবিধাসহ সারা দেশে নতুন ১২টি ফায়ার স্টেশন নির্মাণ ও ৮টি পুরোনো স্টেশনের পুনর্নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি ৫০ হাজার মানুষের জন্য একটি ফায়ার স্টেশন থাকার নিয়ম থাকলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঝুঁকি ও সড়ক পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্থান নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে দেশে ৫৩৮টি স্টেশন চালু রয়েছে, যা গড়ে ৩.৫ থেকে ৪ লাখ মানুষের জন্য একটি। তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অন্তত ১৭০০টি স্টেশন প্রয়োজন। ঘাটতি পূরণে ২০৩০ সালের মধ্যে ৯৯৭টি স্টেশনে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
রেসপন্স টাইম কমিয়ে আনতে টোল-ফ্রি নম্বর ‘১০২’ চালু করা হয়েছে। যানজট কাটাতে একই সঙ্গে ২-৩টি ইউনিট পাঠানো হচ্ছে এবং ঢাকায় ৪১টি পয়েন্টে জরুরি ইকুইপমেন্ট মজুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি এক লাখ কমিউনিটি ভলান্টিয়ার তৈরির লক্ষ্য নিয়ে তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ ও এনআইডি-ভিত্তিক ডেটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে।
প্রযুক্তিগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কেনাকাটা ই-জিপির আওতায় আনা হয়েছে। ভবিষ্যতে বহরে সার্ভেইল্যান্স ড্রোন, রোবটিক ফায়ার ফাইটিং ভেহিক্যাল ও রেসকিউ হেলিকপ্টার যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ৭ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প মোকাবিলায় ঢাকার বাইরে থেকে ১০০টি বিশেষ ফায়ার স্টেশন প্রস্তুত রাখা, সেনাবাহিনী ও অন্যান্য সংস্থার ভারী যন্ত্রপাতি সমন্বয় করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
আইনি সক্ষমতা বাড়াতে ফায়ার সার্ভিস আইন ও বিধিমালার ৯৯ শতাংশ সংশোধন শেষ হয়েছে। তবে নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেট না থাকায় অনিয়ম রোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় প্রতিনিয়ত জটিলতা তৈরি হচ্ছে, এজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রেষণে ম্যাজিস্ট্রেট যুক্ত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। অটোমেটেড ই-লাইসেন্স চালুর ফলে দুর্নীতি বন্ধ হয়েছে এবং রাজস্ব আয় ১৪-১৫ কোটি থেকে ৩৫-৪০ কোটি টাকায় উন্নীত হওয়ার আশা করা হচ্ছে। দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবন মালিকদের ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ও ফায়ার সেফটি আইন মেনে ভবন নির্মাণের আহ্বান জানান ডিজি।