রাষ্ট্রপতি পদে দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী হিসেবে দলীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই চূড়ান্তভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে মির্জা ফখরুলের প্রার্থিতা চূড়ান্ত করেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠক শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। মনোনয়ন ঘোষণার পরপরই দেশের সর্বোচ্চ পদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ও সাংগঠনিক নিয়ম মেনে বিএনপির মহাসচিব পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
উল্লেখ্য, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নিযুক্ত হন। বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। বিশেষ করে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ কারাবাস এবং তৎকালীন তারেক রহমানের বিদেশে অবস্থানকালে চরম প্রতিকূল ও সংকটময় সময়ে বিএনপিকে সুসংগঠিত রাখতে তিনি ঢাল হয়ে ছিলেন। বিগত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক কারণে তাঁকে অন্তত ছয়বার কারাবরণ করতে হয়েছে। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে মির্জা ফখরুল একজন পরিচ্ছন্ন, সংযমী ও সর্বজনগ্রাহ্য প্রভাবশালী নেতা হিসেবে ব্যাপকভাবে সমাদৃত।
সাম্প্রতিক অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নতুন মন্ত্রিসভায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি।
প্রসঙ্গগত, গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তাঁর পদত্যাগের পর থেকে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধানের মূল বিধান অনুসারে, রাষ্ট্রপতির পদ খালি হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়।
নির্বাচন কমিশন ঘোষিত অফিসিয়াল তফসিল অনুযায়ী, আজ বিকেল চারটার মধ্যে নির্বাচন ভবনে রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র সশরীরে জমা দিতে হবে। এরপর নির্বাচন কমিশন কর্তৃক জমা পড়া মনোনয়নপত্রগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে। আগামী ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। যদি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মাঠে থাকেন, তবে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য গোপন ব্যালটে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বিত প্রার্থী হিসেবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থী করা হয়েছে। আজ বেলা ১১টার দিকে নির্বাচন কমিশনারের কাছে কর্নেল (অব.) অলির মনোনয়নপত্র দাখিল করেন জোটের প্রতিনিধিরা।
যদি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে কেউ সরে না দাঁড়ান বা প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করেন, তবে বাংলাদেশে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সংসদীয় পদ্ধতিতে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য ভোটাভুটি প্রত্যক্ষ করবে দেশবাসী। এর আগে ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদে এভাবে রাষ্ট্রপতি পদে উন্মুক্ত ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে প্রতিবারই একক প্রার্থী থাকায় ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেশের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হয়ে এসেছেন।
তবে সাংবিধানিক হিসাব ও গণপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন জাতীয় সংসদের নির্বাচিত এমপিদের ভোটাভুটিতে। বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বিএনপির এককভাবে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতসহ বিরোধী শিবিরের মোট আসনসংখ্যা সংরক্ষিত নারী আসন মিলিয়ে ৯০টি। ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সমীকরণে জাতীয় সংসদে বিএনপির ভূমিধস সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ভোটাভুটিতে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিজয়ী হওয়া নিশ্চিত। সেই হিসেবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই হতে যাচ্ছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২৩তম মহিমান্বিত রাষ্ট্রপতি।