ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬,  ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
গাজীপুর আদালতে এক বিচারপ্রার্থীর অভিজ্ঞতা: আইনি পেশার মর্যাদা ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি প্রশ্ন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শ্রদ্ধা জানাতে এসে আটক যুবলীগ কর্মী অর্ণব দাস দুই আসামির ফাঁসির আপিল হাইকোর্টের কার্যতালিকায় সীতাকুণ্ডে দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজে মিলল বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড ব্রিটেনকে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র’ বলে নজিরবিহীন কটাক্ষ নেতানিয়াহুর বাংলাদেশে নীরব ঘাতক হয়ে উঠছে প্যারাকোয়াট হাসানের পর তাইজুলের আঘাত, চাপে অস্ট্রেলিয়া ১ হাজার শয্যায় উন্নীত হলো ঢাকার নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল দেশের বাজারে আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম: চলতি বছরে ১০৪ বার সমন্বয় ওয়েদারাল্ডের পর এবার ট্রাভিস হেডকেও বোল্ড করলেন হাসান

আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট: সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক প্রয়াণের ৫১ বছর


  • আপলোড সময় : শনিবার ১৫ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ৮:৫৮ এএম

আজ ইতিহাসের অন্যতম এক বেদনাবিধুর ও বিষাদময় দিন, শোকাবহ ১৫ আগস্ট। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম প্রয়াণ দিবস আজ। ১৯৭৫ সালের এই অভিশপ্ত ও কালরাতে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে রচিত হয়েছিল সবচেয়ে নির্মম, জঘন্য ও কলঙ্কিত এক অধ্যায়। তৎকালীন একদল বিপথগামী ও উদগ্র সেনাসদস্যের বুলেটের আঘাতে ধানমন্ডির ঐতিহাসিক বাসভবনে নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে। কেবল তাকেই নয়, ঘাতকের দল সেদিন সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এই বর্বর হত্যাকাণ্ডে বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবার-পরিজন ও নিকটাত্মীয়সহ মোট ২৬ জনকে অকাতরে জীবন দিতে হয়েছিল। ঘটনার রাতে ভাগ্যক্রমে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করার কারণে অলৌকিকভাবে প্রাণ বাঁচান। পরবর্তীতে তাঁরা দীর্ঘ সময় নির্বাসিত জীবন কাটাতে বাধ্য হন এবং সেখান থেকেই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় পদার্পণ করেন।


১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই অন্ধকার রাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাসভবনে ঘাতকের বর্বরোচিত বুলেট বঙ্গবন্ধুর বুকে আঘাত হানার পাশাপাশি ঝাঁজরা করে দিয়েছিল তাঁর প্রিয় সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের পরান। ঘাতকের নির্মম শিকার হন বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল, মেজ পুত্র শেখ জামাল এবং তাঁর কনিষ্ঠ শিশুপুত্র ১০ বছরের অবুঝ শিশু শেখ রাসেল। বাদ যাননি পরিবারের দুই নবপরিণীতা বধূ, অর্থাৎ শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল এবং শেখ জামালের স্ত্রী রোজী জামালও। সেদিন বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসেরকেও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছিল। শুধু স্বজনদের ওপর আক্রমণ করেই ঘাতকেরা ক্ষান্ত হয়নি, বরং বিপদের সময়ে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে জরুরি টেলিফোন কল পেয়ে তাঁর জীবন বাঁচাতে তাৎক্ষণিকভাবে ছুটে আসা বিশ্বস্ত ও অকুতোভয় নিরাপত্তাকর্মীদের ওপরও নির্দয়ভাবে গুলি বর্ষণ করা হয়। সেই মর্মান্তিক ঘটনায় প্রাণ বিসর্জন দেন রাষ্ট্রপতির তৎকালীন মূল নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিল, বিশেষ শাখার কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান এবং সশস্ত্র বাহিনীর অকুতোভয় সেনাসদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হক।


ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের মূল বাসভবনের পাশাপাশি সেদিন ঘাতক চক্রের অপর একটি দল একযোগে শহরের অন্যান্য স্থানেও নারকীয় তান্ডব ও রক্তাক্ত হামলা চালিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ভাগনে তথা তৎকালীন যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মনির ধানমন্ডিস্থ বাসভবনে পৈশাচিক হামলা চালিয়ে তাঁকে এবং তাঁর অন্তর্বর্তীকালীন সন্তানসম্ভবা স্ত্রী আরজু মনিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঠিক একই সময়ে বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি তথা তৎকালীন মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাতের মিন্টো রোডের বাসভবনে ঘাতক দল তাণ্ডব চালায়। সেই кровавый হামলায় আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তাঁর অবুঝ কন্যা বেবী, পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, শিশু নাতি সুকান্ত বাবু, সেরনিয়াবাতের বড় ভাইয়ের সুযোগ্য পুত্র সজীব সেরনিয়াবাত এবং তাঁদের এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় রেন্টু খানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এক রাতে একাধিক স্থানে পরিচালিত এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড সমগ্র দেশ ও বিশ্ববাসীকে এক গভীর স্তব্ধতা ও দীর্ঘস্থায়ী শকের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল।


ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণের প্রক্রিয়ায় দেশের রাজনীতি ও সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বহু উত্থান-পতন ঘটেছে। ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর সেই বছর রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রথমবার এই ১৫ আগস্ট দিনটিকে ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে পালন করার ঐতিহাসিক সরকারি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০১ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রীয় সেই শোক দিবসের সিদ্ধান্তটি বাতিল করা হয়। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় ২০০৭ সালে তৎকালীন ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে পুনরায় ১৫ আগস্টকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে পালন করার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং রাষ্ট্রীয় ছুটি বহাল রাখে।


তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটে ২০২৪ সালে। ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। দেশের পটপরিবর্তনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় শোক দিবস ও এই সংক্রান্ত সরকারি ছুটি বাতিল ঘোষণা করে। অতীতে শোক দিবসে প্রতি বছর অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধে এবং ঢাকার বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্টে নিহতদের স্মরণে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দলীয় নেতাকর্মীরা। এর পাশাপাশি দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংগঠনগুলো বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করত। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিশেষ মিলাদ মাহফিল, দোয়া ও কাঙালিভোজের ব্যাপক আয়োজন করা হতো।


কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন বিক্ষুব্ধ জনতা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক ভবনটিতে হামলা চালিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে সেখানে সব ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক শোক জানানোর কর্মসূচি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের সেই বাড়িটি ভেঙে দেওয়ায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো সেখানে প্রকাশ্যে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ চিরতরে হারায়। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদের পর দেশের নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও এখনো পর্যন্ত ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটি ভাঙাচোরা ও ধ্বংসস্তূপ অবস্থাতেই পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।


উল্লেখ্য যে, দেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং দলটির বিভিন্ন সারির শীর্ষ নেতাদের বিচারকার্য সম্পূর্ণ ও চূড়ান্তভাবে নিষ্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগসহ এর সব সহযোগী ও অঙ্গ সংগঠনগুলোর যেকোনো ধরণের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় গত বছরের ১০ মে আওয়ামী লীগের সমস্ত দলীয় কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। এমনকি তার আগে গত বছরের ২৩ অক্টোবর আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতীম ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগকেও আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়।


রাজনৈতিক ময়দানে সরাসরি কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ না থাকলেও ও দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলটির সক্রিয়তা চোখে পড়ে। গত বছর ১৪ আগস্ট আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে ১৫ আগস্ট উপলক্ষে শোক জানিয়ে পোস্ট দেওয়া হয়েছিল। চলতি বছরও একইভাবে দেশের এই বিষাদময় রাজনৈতিক পটভূমিতে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তাঁদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে শোক প্রকাশ করে বার্তা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে সার্বিকভাবে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরকেন্দ্রিক প্রথাগত শ্রদ্ধা নিবেদনের চিত্র এখন শুধুই অতীত স্মৃতি এবং ঢাকার সেই ভাঙাচোরা বাড়িটি এখন নীরবভাবে দেশের ইতিহাসের এক বিশাল রাজনৈতিক পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর