শরীরে হরমোন বা টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কত হলে একজন অ্যাথলেট নারীদের শ্রেণিতে প্রতিযোগিতার বৈধ অধিকার হারান—এটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের দীর্ঘদিনের এক চরম বিতর্কের বিষয়। এবার সেই বৈশ্বিক বিতর্কের একটি ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন প্রভাব পড়ল বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে। শারীরিক পরীক্ষায় পুরুষ প্রমাণিত হওয়ায় জান্নাত বেগম ও কবিতা রায় নামে দেশের দুই শীর্ষ নারী অ্যাথলেটকে নারীদের সব ধরনের প্রতিযোগিতা থেকে আজীবন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁদের অর্জিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের সমস্ত পদক ও রেকর্ড বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন।
মূলত এই দুই অ্যাথলেটের শরীরে যে পরিমাণ হরমোনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, তা সাধারণ কোনো নারীর শরীরে থাকা মাত্রার চেয়ে বহু গুণ বেশি। আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্র ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের মানদণ্ড অনুযায়ী এই ধরনের হরমোন মাত্রার ব্যক্তিদের নারী নয়, বরং পুরুষ হিসেবে নির্দেশ করা হয়। বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার পর বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন তাঁদের নারীদের অ্যাথলেটিকস সম্পর্কিত যাবতীয় কার্যক্রম থেকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করার এই কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
নিষিদ্ধ হওয়া জান্নাত বেগম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন নিয়মিত অ্যাথলেট ছিলেন এবং কবিতা রায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হয়ে দীর্ঘদিন ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। দীর্ঘদিন ধরেই তাঁদের লিঙ্গ নির্ধারণসংক্রান্ত জটিলতা ও হরমোনজনিত বিতর্ক চলছিল। পরবর্তীতে এই অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষিত বিবেচনা করে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ের শারীরিক পরীক্ষার অনুরোধ জানানো হয়।
পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষ মেডিকেল বোর্ড গঠন করে নিখুঁতভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। পরীক্ষা শেষে অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের কাছে জমা দেওয়া চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকেই দুই অ্যাথলেটের বিষয়ে এই চরম সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিকস’-এর সুনির্দিষ্ট বিধিমালা অনুসরণ করে ফেডারেশনের নির্বাহী কমিটির সভায় তাঁদের নারী অ্যাথলেট হিসেবে প্রতিযোগিতা করার যোগ্যতা স্থায়ীভাবে রদ করা হয়।
উল্লেখ্য, জান্নাত বেগম ছিলেন জ্যাভলিন ও ডিসকাস থ্রো ইভেন্টে জাতীয় রেকর্ডের গর্বিত মালিক। তাঁর সমৃদ্ধ ঝুলিতে ছিল আটটি স্বর্ণ, একটি রুপা এবং দুটি ব্রোঞ্জ পদক। অন্যদিকে দ্রুততম মানবী ইভেন্টের অন্যতম শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী কবিতা রায় ১০০ মিটার, ২০০ মিটার এবং ৪×১০০ মিটার রিলে ইভেন্টে মোট একটি স্বর্ণ, একটি রুপা ও দুটি ব্রোঞ্জ পদক জয় করেছিলেন। অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন তাঁদের সমস্ত পদক এবং জাতীয় রেকর্ড তালিকা থেকে একযোগে মুছে ফেলেছে।
বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বখ্যাত অলিম্পিয়ান দৌড়বিদ ক্যাস্টার সেমেনিয়ার মামলার মতো জটিল আইনি লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে গৃহীত এই সিদ্ধান্ত কার্যত বিশ্ব মানদণ্ডেরই সরাসরি প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে জৈবিক বৈচিত্র্য (ডিএসডি) সংক্রান্ত আইনের যে কঠোর নীতি বজায় রয়েছে, বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনও সেই একই কঠোর পথ বেছে নিল। তবে একই সাথে খেলার মাঠে আত্মনিয়োগ করা অ্যাথলেটদের জন্মগত শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এভাবে হঠাৎ ছিটকে পড়া এবং ক্যারিয়ার ধ্বংসের মুখোমুখি হওয়ার বিষয়টি ক্রীড়াঙ্গনে এক গভীর মানবিক অনুভূতিরও জন্ম দিয়েছে।