আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি।
বরগুনার আমতলীতে একে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র জাবেদ ইমনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও সঠিক বিচারের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করে তুমুল বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ। ঘটনার দীর্ঘ ২০ দিন অতিক্রান্ত হলেও মূল ঘাতকদের চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার করতে না পারায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে পুলিশ প্রশাসনকে আগামী ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আসামিরা ধরা না পড়লে পুরো জেলাজুড়ে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার স্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়।
রোববার (১৬ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত আমতলী-কুয়াকাটা মহাসড়কের অত্যন্ত ব্যস্ততম একে স্কুল পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও সহস্রাধিক নারী-পুরুষ এই সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। ঘণ্টাভিত্তিক অবরোধের কারণে মহাসড়কের উভয় পাশে শত শত যানবাহন আটকে পড়ে তীব্র যানজট ও সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে খবর পেয়ে স্থানীয় থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে দ্রুততম সময়ে ঘাতকদের গ্রেপ্তারের সুনির্দিষ্ট আশ্বাস প্রদান করলে শিক্ষার্থীরা সাময়িকভাবে অবরোধ প্রত্যাহার করে নেন।
নিহত ইমনের সহপাঠী হিরা, মেহেদী, জিসান, মিশকাত ও রাকিবসহ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে জানান, মর্মান্তিক এই হত্যাকাণ্ডের এতগুলো দিন পার হয়ে গেলেও পুলিশ প্রশাসন এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি বা রহস্য উন্মোচন করতে পারেনি। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যদি অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা না হয়, তবে আমতলীজুড়ে কঠোর অচল অবস্থা তৈরি করা হবে।
নিহতের পারিবারিক ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, আমতলী উপজেলার মধ্য আড়পাঙ্গাশিয়া গ্রামের বাসিন্দা আউয়াল প্যাদার ছোট ছেলে জাবেদ ইমন গত ২৬ জুলাই বিকেলে স্থানীয় আড়পাঙ্গাশিয়া বাজারে যায়। সে সময় বাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ী ইমরান তালুকদার (হৃদয়) ইমনকে ডেকে নিয়ে নিজের দোকানে বসান। পরবর্তীতে ইমনের বন্ধু সাজিদকে সেই দোকানে বসিয়ে রেখে ইমরান চতুরতার সঙ্গে স্কুলছাত্র ইমনকে একটি অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যান। এরপর থেকেই রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয় ইমন।
পরদিন ২৭ জুলাই আড়পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের বহিষ্কৃত ছাত্রদল সদস্য সচিব সগির বিশ্বাস নিখোঁজ ইমনকে খুঁজে দেওয়ার নাম করে তার বাবার কাছে ১০ হাজার টাকা দাবি করেন এবং সে আমতলীর বালিয়াতলীতে রয়েছে বলে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন। এভাবে সগির বিশ্বাস টানা তিন দিন ইমনের পরিবারকে নানাভাবে হয়রানি ও মানসিক নির্যাতন করেন।
পরবর্তীতে গত ২৯ জুলাই সন্ধ্যায় মধ্য আড়পাঙ্গাশিয়া এলাকার পায়রা নদীর পাড় থেকে একটি বস্তাবন্দি অজ্ঞাত গলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সুরতহালে লাশ পচে বিকৃত হয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে স্বজনেরা তা শনাক্ত করতে পারেননি। ফলে ৩০ জুলাই পুলিশ বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহটি ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে দাফন সম্পন্ন করে। পরবর্তীতে ৩১ জুলাই পুলিশ নিহতের পরিবারকে ডেকে এনে মরদেহে থাকা পোশাক ও আলামত দেখালে ইমনের বাবা আউয়াল প্যাদা উদ্ধারকৃত লাশটি তাঁরই সন্তান জাবেদ ইমনের বলে নিশ্চিত হয়ে শনাক্ত করেন।
এই ঘটনায় গত ৫ আগস্ট নিহত ইমনের বাবা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করার পর আমতলী থানা পুলিশ মামলাটির সুষ্ঠু তদন্তের দায়িত্ব সোপর্দ করে নিদ্রা সকিনা নৌ-পুলিশের ইনস্পেক্টর সাগর ভন্দ্রকে। তবে লাশ শনাক্তের পরপরই প্রধান সন্দেহভাজন ব্যবসায়ী ইমরান তালুকদার ও সগির বিশ্বাস এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান।
সার্বিক অগ্রগতি সম্পর্কে আমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইয়াকুব হোসাইন জানান, নামীয় আসামি না থাকায় এবং প্রাথমিকভাবে অজ্ঞাত হিসেবে তদন্ত শুরু হওয়ায় আসামিদের চিহ্নিত করতে সামান্য বিলম্ব হচ্ছে। তবে পুলিশ ইতিমধ্যেই মূল ক্লু উদঘাটনে সর্বাত্মক তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করা হবে। তিনি আরও জানান, পুলিশের আশ্বাসে এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে শিক্ষার্থীরা সুশৃঙ্খলভাবে তাঁদের অবরোধ কর্মসূচি তুলে নিয়েছেন।