টানা ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। রাতভর বৃষ্টির পর সোমবার সকাল থেকেই থমকে গেছে নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতে কোথাও হাঁটুসমান, আবার কোথাও কোমরসমান পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে এক নারকীয় পরিস্থিতির। এতে করে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন অফিসগামী মানুষ, সাধারণ পথচারী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানমুখী শিক্ষার্থীরা।
গত রোববার রাত থেকেই চট্টগ্রামে শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। সোমবার সকালে বৃষ্টির তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পেলে নগরীর রাহাত্তারপুল, বাকলিয়া, চকবাজার, নিউমার্কেট, রিয়াজউদ্দিন বাজার, কাপাসগোলা ও কাতালগঞ্জসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। এমনকি নগরীর গুরুত্বপূর্ণ আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভারেও সৃষ্টি হয়েছে জলজট। ফ্লাইওভারের ওপর থেকে নিচে ঝরনার মতো পানি পড়তে দেখা গেছে, যা চলাচলে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করেছে।
আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভারী বর্ষণের এই ধারা আরও কিছুদিন বজায় থাকতে পারে। পতেঙ্গা আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস কর্মকর্তা মো. ইসমাইল ভূঁইয়া জানান, সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে কেবল সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টাতেই বৃষ্টি হয়েছে ৮১ মিলিমিটার। লঘুচাপের প্রভাব ও মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকার কারণে চট্টগ্রামে আরও দুই থেকে তিন দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, নগরীর আমবাগান আবহাওয়া দপ্তরের কর্মকর্তা ইনচার্জ বিজয় রায় জানিয়েছেন, তাদের সেন্টারে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সেখানেও সকাল ৬টা থেকে পরবর্তী তিন ঘণ্টায় ৮১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হওয়ার তথ্য মিলেছে।
ভারী বর্ষণ আর জমে থাকা পানির কারণে চট্টগ্রাম নগরীর প্রধান প্রধান সড়কে যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় ধীরগতিতে যানবাহন চললেও নিচু এলাকাগুলোতে পানি মাড়িয়ে ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন পথচারীরা। তার ওপর নগরীতে চলমান গ্যাস সংকটের কারণে গণপরিবহনের সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম। গ্যাসের সরবরাহে ঘাটতি থাকায় অধিকাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা সড়কে নামাতে পারেননি চালকেরা। ফলে একদিকে কোমরপানি, অন্যদিকে গণপরিবহন সংকট—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কর্মজীবী মানুষ ও কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
নগরীর রাহাত্তারপুল এলাকার বাসিন্দা খাদিজা জান্নাত সুজন নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাত থেকে টানা বৃষ্টিতে সকালে রাস্তায় বের হয়ে দেখেন হাঁটুসমান পানি। প্রতি বছর বর্ষা এলেই তাদের একই দুর্ভোগ পোহাতে হয়, কিন্তু এর কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। বাকলিয়া এলাকার বাসিন্দা ফকরুল আলম জানান, সকালে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়ে তিনি রাস্তায় থৈ থৈ পানি দেখতে পান। তার ওপর যানবাহনের তীব্র সংকট থাকায় সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বহদ্দারহাট এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবী এস এম গিয়াস উদ্দিন বলেন, সড়কে পানি জমে থাকায় স্বাভাবিকভাবে হেঁটে চলার পরিবেশও নেই। শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে, বাধ্য হয়ে তাদের পানি মাড়িয়েই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে।
জলাবদ্ধতার এই প্রভাব শুধু চট্টগ্রাম মহানগরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের উপজেলাগুলোতেও। ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে বোয়ালখালী উপজেলার বিভিন্ন নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বোয়ালখালীর চরখিজিরপুর-সাতগড়িয়াপাড়া এলাকায় বর্ষা শুরু হওয়ার পর থেকেই স্থায়ী জলাবদ্ধতায় চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সড়কে হাঁটু পানি জমে থাকায় স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদের দৈনন্দিন চলাচলে চরম স্থবিরতা নেমে এসেছে।
চট্টগ্রাম নগরবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, সামান্য ভারী বৃষ্টি হলেই নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং প্রধান প্রধান সড়কে পানি জমে যায়। এবারও রাতভর বৃষ্টির পর সোমবার সকাল থেকে পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতি ঘটে। দ্রুত সময়ের মধ্যে পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রতি বছরের এই দীর্ঘমেয়াদী জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে টেকসই ও স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী চট্টগ্রামবাসী।