রাজধানীর একটি মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রকে ব্যবসার আড়ালে কার্যত এক গোপন বন্দিশালায় পরিণত করার এক ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে হক গ্রুপের কর্ণধার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আদম তমিজী হককে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক গ্রেপ্তারের পর তাকে সরাসরি কারাগারে না পাঠিয়ে একটি বেসরকারি রিহ্যাব সেন্টারে বেআইনিভাবে আটকে রাখার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তৎকালীন প্রধান হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধে। শুধু তাকে সেখানে বেআইনিভাবে আটকে রাখাই হয়নি, বরং নানা চক্রান্তের মাধ্যমে তাকে একজন মানসিক রোগী হিসেবে প্রমাণেরও অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। এ ঘটনায় উক্ত নিরাময়কেন্দ্রটির প্রত্যক্ষ জড়িত থাকা, পরিবার থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় এবং তৎকালীন প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় কীভাবে প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে এমন বন্দিশালা গড়ে তোলা হয়েছিল—সেসব নিয়ে একের পর এক চাঞ্চল্যকর ও বিস্ফোরক তথ্য বেরিয়ে আসছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৩ সালের ৯ ডিসেম্বর হক গ্রুপের কর্ণধার ও ব্যবসায়ী আদম তমিজী হক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক লাইভে এসে তৎকালীন সরকারের নানা কার্যক্রম নিয়ে কড়া বিষোদ্গার করেন। এর পরপরই তমিজীকে গ্রেপ্তারের পেছনে তৎপর হয়ে ওঠেন তৎকালীন বহুল আলোচিত ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ। একপর্যায়ে তমিজীকে গ্রেপ্তার করা হলেও দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়নি। তার পরিবর্তে তাকে বন্দি করে রাখা হয় রাজধানীর একটি অভিজাত মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে। পরবর্তীতে তমিজীর পরিবারের কাছ থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে কয়েক দফায় বিশাল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয় ডিবি হারুন ও তার সহযোগী একটি দল।
ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, এই অনৈতিক কাজে ডিবি হারুন একা যুক্ত ছিলেন না। তমিজীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে সেখানে আটকে রাখার সুবিধার্থে 'বীকন পয়েন্ট' নামের ওই বিশেষ নিরাময়কেন্দ্রটি সার্ভিস চার্জ হিসেবে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। পরিস্থিতি আরও জটিল করতে এবং তমিজীকে জোরপূর্বক মানসিক রোগী হিসেবে প্রমাণের জন্য বাইরে থেকে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে ডেকে আনা হয়। কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আগত চিকিৎসকদের কেউ তাকে মানসিক রোগীর সনদ দিতে সম্মত না হওয়ায় ডিবি হারুনের পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা লাগে।
ওই সময় সেখানে উপস্থিত থাকা ভুক্তভোগী চিকিৎসা দলের একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তারা সেখানে গিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে আদম তমিজী হককে কোনোভাবেই মানসিক রোগী বলে মনে করেননি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ডিবি হারুন তাকে জোর করে ওই প্রতিষ্ঠানে আটকে রাখার জন্য নানা চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। তখন চিকিৎসকরা স্পষ্ট জানান যে, আদালতের লিখিত নির্দেশনা ছাড়া কাউকে এভাবে আটকে রাখা যায় না। এ কথা শুনে হারুন তাদের ওপর চরম ক্ষিপ্ত হন এবং ওই নিরাময়কেন্দ্রের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও চিকিৎসকদের সঙ্গে মারাত্মক অশালীন ও চরম দুর্ব্যবহার করেন।
সূত্র আরও নিশ্চিত করেছে, কোনো প্রকার বৈধ চিকিৎসা সনদ বা আদালতের নির্দেশনা ছাড়াই তমিজীকে সেখানে দিনের পর দিন বন্দি রাখা হয়। বিষয়টি যেন সম্পূর্ণ গোপন থাকে, সে জন্য নিরাময়কেন্দ্রটির একটি পুরো ফ্লোর অন্য সব রোগীদের সরিয়ে ফাঁকা করে দেওয়া হয়। সেখানে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় তমিজীকে একাকী বন্দি রাখা হয় এবং তার জন্য পৃথক বিলাসবহুল খাবার, পানীয় ও নানা বিনোদনেরও বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।
এই অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক উপপরিচালক জানান, বীকন পয়েন্টে তমিজী হককে অন্যায়ভাবে আটকে রাখার সার্বিক ঘটনা অধিদপ্তরের নজরে আসার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। কারণ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ডিবি হারুনের অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা সর্বজনবিদিত ছিল। হারুন যেসব বেআইনি বা অপকর্ম করতেন, তার পেছনে মন্ত্রণালয়ের অদৃশ্য সংকেত রয়েছে বলে সবাই মনে করতেন।
তথ্য অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে যে, শুধু আদম তমিজী হক একা নন, রাজধানীতে পরিচালনা করা এই জাতীয় নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে এমন অমানবিক ঘটনা অহরহ ঘটছে। কখনো পরকীয়া প্রেমিকের সহায়তায় স্বামীকে মাদকাসক্ত সাজিয়ে স্ত্রী আটকে রাখছেন, আবার কখনো সম্পত্তির লোভে ভাই আটকে রাখছেন ভাইকে। এমনকি নিরাময়কেন্দ্রের অভ্যন্তরে চিকিৎসার নামে ধর্ষণের শিকার হওয়ার মতো রোমহর্ষক ঘটনাও ঘটেছে, যা সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে স্বজনরা প্রকাশ করেননি। ভুল চিকিৎসায় রোগী মারা গেলে লাশ গুম ও দীর্ঘসময় লুকিয়ে রাখার মতো অভিযোগও রয়েছে। তবে অজ্ঞাত প্রভাব ও প্রশাসনিক রহস্যময় নিরবতার কারণে অপরাধীরা থেকে যাচ্ছেন অধরা।