দেশের ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নতুন চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান। বুধবার (১৯ আগস্ট) দুদকের প্রধান কার্যালয়ে নতুন কমিশনের প্রথম কার্যদিবসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। এ সময় কমিশনের অপর দুই কমিশনার ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে নতুন দুদক চেয়ারম্যান বলেন, আপনারা আমাদের জন্য দোয়া করবেন, যেন আমরা মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশের জন্য কাজ করতে পারি। একই সাথে দুর্নীতি দমন কমিশনের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে এবং দেশ দুর্নীতিমুক্ত করতে যথেষ্ট চেষ্টা চালাতে পারি। ইনশাআল্লাহ আগামী দিনে আমরা ভালো ফল আনব।
স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে কমিশন কোনো প্রকার রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপে থাকবে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান বলেন, ইনশাআল্লাহ, আমরা কোনো চাপের মধ্যে নেই। আমরা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করছি। আমাদের সামনে কোনো সমস্যা এলে তা যথাযথভাবে সমাধান করার চেষ্টা করব। মূলতঃ মানুষের প্রত্যাশাকে সামনে রেখেই আমরা এখানে এসেছি। প্রথম দিনেই সব পরিকল্পনা শুনে নেওয়ার বিষয়ে হালকা ছলে তিনি আরও বলেন, প্রথম দিনেই যদি আপনারা সব শুনে নেন, তাহলে বাকি দিন কী করবেন? আমরা তো দীর্ঘদিন আপনাদের সঙ্গে কাজ করব।
কমিশনের কাজের রূপরেখা নিয়ে অপর এক প্রশ্নের জবাবে দুদক কমিশনার ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশের একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ বিচারক এই কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আমরা তাঁর দক্ষ নেতৃত্বে প্রতিটি বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত দেব। আশা করি, আপনারা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এসব বিষয়ে কাজের ভালো অগ্রগতি জানতে পারবেন।
জানা গেছে, বুধবার নতুন দুদক চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান এবং দুই কমিশনার ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া প্রথম দিনের মতো কার্যালয়ে অফিস করেন। সকাল ৯টার দিকে তারা দুদক ভবনে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে সকাল ১০টায় পূর্বনির্ধারিত মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। উক্ত সভায় দুদক সচিব সাইদুর রহমান ও মহাপরিচালকসহ উপ-পরিচালক পর্যায় পর্যন্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে গত ১৮ আগস্ট বেলা ২টায় তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে যোগদান করেছেন বলে নিশ্চিত করেন দুদক সচিব সাইদুর রহমান। গত সোমবার সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। একই প্রজ্ঞাপনে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির স্বাক্ষর করা এক প্রজ্ঞাপন সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
উল্লেখ্য, নতুন নিয়োগ পাওয়া চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। তিনি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আপিল বিভাগ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি দীর্ঘকাল হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি আপিল বিভাগ থেকে অবসরে যান।
অন্যদিকে কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক কর কমিশনার ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। অপর কমিশনার ড. জাহাঙ্গীর আলম খান একজন অবসরপ্রাপ্ত সচিব এবং তিনি ৮৫ ব্যাচের বিসিএস কর্মকর্তা ছিলেন।
উল্লেখ্য, গত ৩ মার্চ দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যানসহ তিন কমিশনার পদত্যাগ করার পর নতুন কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেয় সরকার। নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের লক্ষ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে সদস্যসচিব করে একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। সার্চ কমিটি ছয় দফা বৈঠক করে সম্ভাব্য প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত যাচাই-বাছাই ও যোগ্যতা পর্যালোচনা করে। পরবর্তীতে চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার হিসেবে এ কে এম আসাদুজ্জামান, ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার নাম চূড়ান্ত করে সরকারের কাছে সুপারিশ পাঠায়।
২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন দুদকের প্রথম চেয়ারম্যান বিচারপতি সুলতান হোসেন খান থেকে শুরু করে সর্বশেষ মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন পর্যন্ত মোট সাতটি কমিশন দায়িত্ব পালন করেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনসহ নানাবিধ জটিলতায় মাত্র তিনটি কমিশন তাদের পুরো মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছিল। বাকি চারটি কমিশনকে তাদের নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করার আগেই বিদায় নিতে হয়। সর্বশেষ মোমেন কমিশনও নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ না করেই দায়িত্ব থেকে বিদায় নিয়েছে। নতুন কমিশন গঠনের মাধ্যমে দুর্নীতি দমনে সংস্থাটির কার্যক্রমে নতুন গতি আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।