দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটের মাধ্যমে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কর্নেল অলি আহমদ ৮৮ ভোট পেয়েছেন। ভোটগ্রহণ শেষে প্রকাশ্যে ব্যালট গণনা করা হয়। পরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচনী কর্মকর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন ফলাফল ঘোষণা করেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোট ছয়জন সংসদ সদস্য ভোট দেননি। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন অসুস্থতার কারণে অনুপস্থিত ছিলেন, একজন বিদেশে অবস্থান করায় ভোট দিতে পারেননি। অন্যদিকে একজন সংসদ সদস্য নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার কারণ হিসেবে ভোটকে অর্থহীন ও প্রহসনের নির্বাচন বলে মন্তব্য করেছেন। আরও একজন সংসদ সদস্যের ভোট না দেওয়ার কারণ জানা যায়নি।
ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস এবং চট্টগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশা অসুস্থতার কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না বলে ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের কাছে চিঠি দিয়েছেন। তাঁদের অনুপস্থিতির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বিএনপির সংসদ সদস্য ও কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ওসমান ফারুকও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে আসেননি। তবে তাঁর ভোটকেন্দ্রে অনুপস্থিত থাকার নির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি।
জামায়াতের সাতক্ষীরা-৪ আসনের বিতর্কিত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণে অংশ নেননি। তিনি ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত না থাকায় তাঁর ভোট দেওয়া হয়নি।
খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্য আবুল হাসানও ভোট দেননি। দলটির মহাসচিব আহমদ আব্দুল কাদের জানিয়েছেন, আবুল হাসান বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন। এ কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ভোট দিতে পারেননি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটে অংশ নেননি। ভোটদানে বিরত থাকার বিষয়ে রুমিন ফারহানা গণমাধ্যমকে বলেন, এই নির্বাচন অর্থহীন এবং প্রহসনের।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ৩৪৯ হওয়ার পেছনেও একটি বিষয় রয়েছে। বিএনপির আসলাম চৌধুরীর সংসদ সদস্য পদ আদালতের রায়ে বাতিল হয়েছে। ফলে তাঁর আসনসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান সংসদে সংরক্ষিত নারীসহ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পর সংসদ সদস্যরা পর্যায়ক্রমে ব্যালটের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেন। ভোটগ্রহণ শেষে ব্যালট বাক্স খোলা হয় এবং প্রকাশ্যে ভোট গণনা করা হয়।
গণনা শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচনী কর্মকর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন ফল ঘোষণা করেন। তিনি জানান, বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়েছেন। অন্যদিকে কর্নেল অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। সর্বোচ্চ ভোট পাওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার বিষয়টি সংবিধানের বিধানের সঙ্গেও সম্পর্কিত। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়ে কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তিনি ওই দল থেকে পদত্যাগ করলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হবে। একইভাবে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিলেও সংসদ সদস্য পদ থাকবে না।
সংবিধানের এই বিধানের কারণে সংসদ সদস্যদের দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে কোনো সংসদ সদস্যের পদ একবার শূন্য হয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সেই নির্বাচনে আবার অংশ নিতে কোনো বাধা নেই বলে উল্লেখ রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিন ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকেও ভোটদানের বিষয়ে একটি অবস্থান জানানো হয়েছিল। ভোট চলাকালে ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমানের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, দলটির একমাত্র সংসদ সদস্য মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ ভোটদানে বিরত থাকবেন।
ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে ভোট না দেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিষয়ে জুলাই সনদে ঐকমত্য হওয়া সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা হয়েছে। এ কারণে দলটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়।
তবে পরে ইসলামী আন্দোলনের সংসদ সদস্য মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ ভোট দিয়েছেন বলে জানা গেছে। ফলে ভোটদানে বিরত থাকা ছয় সংসদ সদস্যের তালিকায় তাঁর নাম থাকেনি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ছয় সংসদ সদস্যের অনুপস্থিতি এবং তাঁদের ভোট না দেওয়ার কারণ দিনভর রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় ছিল। বিশেষ করে অসুস্থতার কারণে মির্জা আব্বাস ও মোস্তফা কামাল পাশার অনুপস্থিতি, বিদেশে অবস্থানের কারণে আবুল হাসানের ভোট দিতে না পারা এবং রুমিন ফারহানার নির্বাচন নিয়ে প্রকাশ্য মন্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে ওসমান ফারুক ও গাজী নজরুল ইসলামের অনুপস্থিতির বিষয়টিও আলোচনায় আসে। তবে ওসমান ফারুকের ভোট না দেওয়ার কারণ জানা যায়নি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বড় ব্যবধানে জয় পাওয়ায় অনুপস্থিত ছয় সংসদ সদস্যের ভোটের বিষয়টি ফলাফল নির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলেনি।
৩৪৯ ভোটারের মধ্যে ২৫৫ ভোট পেয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কর্নেল অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট না দেওয়া ছয় সংসদ সদস্যের অনুপস্থিতি নির্বাচনের একটি আলোচিত বিষয় হলেও শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয় এবং প্রকাশ্য গণনার মাধ্যমে ফল ঘোষণা করা হয়।