দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং কিশোরগঞ্জে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে হঠাৎ করে আয়োজিত কনসার্ট বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় দেশের বিনোদন ও সংগীত অঙ্গনে মারাত্মক হতাশা, ক্ষোভ এবং গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের আমলেও উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর অহেতুক আপত্তির মুখে এবং প্রশাসনের নিরাপত্তাজনিত অজুহাতে একের পর এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাতিল হওয়ায় শিল্পীদের স্বাধীন কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এই অশুভ প্রবণতা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ওপর আঘাত নিয়ে নিজেদের গভীর উদ্বেগ ও স্পষ্ট মতামত ব্যক্ত করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় পাঁচ সংগীতশিল্পী ও বিশিষ্ট সুরকার।
বরেণ্য সুরকার ও সংগীত পরিচালক শেখ সাদী খান এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রসঙ্গে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই একে অন্যকে খোঁচাখুঁচি করার রাজনীতি চললেও পুরো দেশকে সংস্কৃতিমনস্কতার মাধ্যমে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, তা নিয়ে নীতি-নির্ধারকদের চিন্তাভাবনা অনেক কম। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো একটি প্রখ্যাত সংগীতসমৃদ্ধ জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সাম্প্রতিক এই কনসার্ট পণ্ড হওয়ার ঘটনাটি সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা উগ্র মহলের কথায় হঠাৎ সংস্কৃতির চর্চা বন্ধ রাখা গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারের দায়িত্ব ছিল উচ্চ শব্দ কিংবা সামান্য প্রযুক্তিগত ত্রুটি থাকলে তা সমাধান করে সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠান করার সুযোগ করে দেওয়া। তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি জোর দাবি জানান যেন, সারা দেশে বার্তা দেওয়া হয় যে সংস্কৃতি রক্ষার দায়িত্ব সবার এবং যারা সংস্কৃতি চর্চায় বাধা দেবে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সংগীত কিংবদন্তি সাবিনা ইয়াসমীন এই আয়োজক ও শিল্পীদের চরম আর্থিক ক্ষতি এবং মানসিক অনিশ্চয়তার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, কোনো আয়োজন পছন্দ না হলে কারো তা না দেখার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে, তবে ব্যক্তিস্বার্থ বা অপছন্দের কারণে পুরো অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া মারাত্মক অন্যায়। কোনো সংস্থার বা কর্তৃপক্ষের কোনো বিষয়ে আপত্তি থাকলে তা আয়োজনের একদম শুরুতেই স্পষ্ট করে জানানো উচিত, যেন শেষ মুহূর্তে বিশাল অর্থ ব্যয়ের পর তা হুট করে বাতিল করতে না হয়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, গান-বাজনা এ দেশের আবেগের সাথে মিশে রয়েছে এবং রাষ্ট্রকে সার্বিকভাবে সকল শিল্পীর জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর কর্মপরিবেশ সুনিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে জনপ্রিয় ব্যান্ড তারকা হামিন আহমেদ শেষ মুহূর্তে নিবন্ধনের অজুহাত বা উচ্চ শব্দের দোহাই দিয়ে কনসার্ট বাতিল করাকে মূল ঘটনা আড়ালের অপচেষ্টা বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, অতীতে শিল্পীদের অপমান ও কনসার্ট বন্ধে কোনো দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ায় উগ্র গোষ্ঠীগুলো এখন প্রশাসনিকভাবে প্রশ্রয় পেয়ে দ্বিধাহীনভাবে মব তৈরি করার সুযোগ পাচ্ছে। যদি কোনো সংঘটিত উগ্র গোষ্ঠী থানায় ঢুকে ভয় দেখিয়ে লাইভ শো বন্ধ করে দিতে পারে, তবে সেখানে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার সংস্কৃতির প্রসারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে এবং তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও এর প্রতিফলন ছিল। তাই যেকোনো হুমকি এলে প্রশাসন কর্তৃক কনসার্ট বাতিল না করে বরং দর্শক ও শিল্পীদের সার্বিক নিরাপত্তা বিধান করাটাই প্রশাসনের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত।
সংগীতশিল্পী বেবী নাজনীন বলেন, দেশের মূল সাংস্কৃতিক অঙ্গন যদি ধীরে ধীরে এভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে, তবে অন্য দিক দিয়ে দেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। দেশের বর্তমান সরকার অত্যন্ত সংস্কৃতিবান্ধব এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সংস্কৃতির বহুমাত্রিক উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে সমৃদ্ধশালী করতে আগ্রহী। কিন্তু একটি চক্রান্তকারী উগ্র গোষ্ঠী মূলত সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে বিশ্বদরবারে বিতর্কিত ও বেকায়দায় ফেলতেই বারবার এমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। তাই একজন শিল্পীর আয়ের প্রধান মাধ্যম এই কনসার্টগুলোকে সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ রাখার জন্য রাষ্ট্রকে অবিলম্বে কঠোর তদন্তের নির্দেশ দিয়ে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী নাজমুন মুনিরা ন্যান্সি বিষয়টিকে সরাসরি পুরো শিল্প-সংস্কৃতির জন্য এক বড় হুমকি বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে জানান, কনসার্ট একজন পেশাদার শিল্পীর আয়ের প্রধান পথ। অথচ দু-একজনের ব্যক্তিগত ধর্মীয় বা গোষ্ঠীগত পছন্দ-অপছন্দের কারণে পুরো অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের সাংস্কৃতিক অধিকারে ছায়া ফেলা হচ্ছে। নিরাপত্তাহীনতার অজুহাত দেখিয়ে সংস্কৃতিকে পিছিয়ে দেওয়া কোনো সুস্থ রাষ্ট্রের লক্ষণ নয়। বাংলাদেশ কখনোই কোনো জঙ্গি বা ব্যর্থ রাষ্ট্র নয় যে সামান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হবে না। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে দেশের শিল্পীদের নিরাপদ কাজের সুপরিবেশ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান এই তারকারা।