ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ দুই আসামির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। একই সাথে মামলার অন্য চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ১০ আসামিকে খালাস দিয়েছেন আদালত।
২৪ আগস্ট দুপুরে বিচারক ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারক কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, নিয়মিত আপিল এবং জেল আপিলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। আদালতে আসামিপক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনা করেন আইনজীবী এস এম শাহজাহান, বারিস্টার মাসুদ হোসেন দোলন ও আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি উপস্থাপন করেন অ্যাটর্নি জেনারেল বারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির।
এর আগে গত ২০ আগস্ট দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রপক্ষের পেপারবুক উপস্থাপনের মাধ্যমে শুরু হওয়া শুনানির নিষ্পত্তি ঘটে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ডেথ রেফারেন্স ও আপিল মামলাসমূহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির স্বার্থে প্রধান বিচারপতি গত ১০ জুন বিশেষ এই হাইকোর্ট বেঞ্চটি গঠন করে দিয়েছিলেন।
নথিপত্রে লিপিবদ্ধ মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার तत्कालीन অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাত জাহান রাফির শ্লীলতাহানি ঘটান। ওই ঘটনায় নুসরাতের পরিবার মামলা দায়ের করলে পুলিশ সিরাজ উদদৌলাকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে নুসরাতকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করা হলেও তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন থাকেন।
এরই জেরে ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা চলাকালে কৌশলে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে নৃশংসভাবে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। শরীরের সিংহভাগ দগ্ধ অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হলেও টানা চার দিন মৃত্যুর সাথে লড়ে ১০ এপ্রিল নুসরাত শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই বর্বরোচিত ঘটনার পর নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা দায়ের করেন, যা পরবর্তীতে দেশের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান হত্যা মামলায় রূপ নেয়।
পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী নিম্ন আদালতের রায়ের পর মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য নথি হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স হিসেবে পাঠানো হয়। পাশাপাশি সাজাপ্রাপ্ত আসামিরাও বিচারিক আদালতের সাজার বিরুদ্ধে আপিল করেন। দীর্ঘ পথপরিক্রমা শেষে হাইকোর্ট পরিমার্জিত এই রায় চূড়ান্ত করলেন।