ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

ভর্তুকির হাজার হাজার বস্তা সার যাচ্ছে মিয়ানমারে, বিনিময়ে আসছে মাদক!


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সময় : ১১:২১ এএম

দেশের প্রান্তিক কৃষকদের কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর ইউরিয়া ও ডিএপিসহ বিভিন্ন ধরনের সারে বিপুল পরিমাণ অর্থ সরাসরি ভর্তুকি হিসেবে প্রদান করে থাকে। তবে সরকারের এই ভর্তুকিকৃত মূল্যবান সার অবলীলায় পাচার হয়ে যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে। বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত উপকূলীয় পথ ও নৌপথ ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্র প্রতিনিয়ত এই অবৈধ সীমান্ত বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।

 

গত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় সারের বেশ কিছু বড় চালান আটক হলেও পাচারের এই ভয়াবহ প্রক্রিয়াটি কোনোভাবেই স্থায়ীভাবে বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে গত জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসেই সমুদ্র উপকূলে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করে ৩ হাজার ৩১০ বস্তা অবৈধ সার জব্দ করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। বাংলাদেশ থেকে সারের মতো কৃত্রিমভাবে ভ্যালু-অ্যাডেড পণ্য বাইরে চলে গেলেও এর বিনিময়ে বিপরীত সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী সব মাদকদ্রব্য, যার মধ্যে রয়েছে ক্রিস্টাল মেথ বা আইস এবং ইয়াবা।

 

বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ অঞ্চল থেকে অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে ইউরিয়া ও ডায়ামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সার সংগ্রহ করে তা ছোট-বড় কার্গো বোট ও ফিশিং বোটে তোলা হয়। এরপর দুর্গম নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারের উপকূলীয় ও সাগরপথ ব্যবহার করে সরাসরি মিয়ানমারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় চোরাকারবারিরা। বিগত জুলাই মাসে পাঁচটি পৃথক অভিযানে এবং আগস্ট মাসে তিনটি বৃহৎ চালানে মোট ৩ হাজার ৩১০ বস্তা সার জব্দ করে কোস্ট গার্ড। উদ্ধার করা সারের মধ্যে ৭০০ বস্তা ডায়ামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) এবং বাকি সব ইউরিয়া সার ছিল। নিয়মিত টহল থাকা সত্ত্বেও চোরাকারবারিদের এই বেপরোয়া চক্রকে পুরোপুরি থামানো যাচ্ছে না।

 

সর্বশেষ গত সোমবার (৩১ আগস্ট) গভীর রাতে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভাটিয়ারী কোস্ট গার্ড স্টেশন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বঙ্গোপসাগরে এক ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে একটি বড় কার্গো বোট তল্লাশি করে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া ৪১০ বস্তা অবৈধ ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়। উদ্ধারকৃত এই সারের আনুষ্ঠানিক বাজারমূল্য প্রায় ১৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা বলে জানান কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা কর্মকর্তা কর্মকর্তা কোস্ট গার্ড কর্মকর্তা সুজন। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে চোরাকারবারিরা ট্রলার থেকে পানিতে লাফিয়ে কৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

 

এর আগে গত ২৭ আগস্ট চট্টগ্রাম পতেঙ্গা কোস্ট গার্ডের টহল দল দুটি পৃথক কার্গো বোটে অভিযান চালিয়ে ২৮০ বস্তা ইউরিয়া সার এবং ১ হাজার বস্তা উন্নতমানের সিমেন্ট উদ্ধার করে। ঠিক ১০ দিন আগে, অর্থাৎ ১৬ আগস্ট কক্সবাজারের কুতুবদিয়া সংলগ্ন চ্যানেলে কোস্ট গার্ড একটি সাগরে ভাসমান মাছ ধরার নৌকা বা ফিশিং বোটে অভিযান চালিয়ে ৬০ বস্তা ইউরিয়া সার ও ২৫০ বস্তা সিমেন্ট আটক করে। তদন্তকারীদের দাবি, সিমেন্ট ও সার দুটিই বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে মিয়ানমারে পাচারের পরিকল্পনা ছিল।

 

চলতি বছরের জুলাই মাসেও সাগরে একই ধরনের অসংখ্য পাচারবিরোধী সফল অভিযান চালায় কোস্ট গার্ড। গত ৩১ জুলাই পতেঙ্গা এলাকায় দুটি ফিশিং বোটে তল্লাশি চালিয়ে ৪৫০ বস্তা ডিএপি সার জব্দ করার পাশাপাশি পাচারের সরাসরি অপরাধে ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একই দিনে পতেঙ্গার ১৫ নম্বর ঘাট এলাকা থেকে ১ টন খনিজ কয়লা ও ৬০০ কেজি গমের ভুসিও উদ্ধার করা হয়। এর আগে ২৮ জুলাই নোয়াখালীর ভাসানচর সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর এলাকা থেকে একটি বিশাল কার্গো বোটে তল্লাশি চালিয়ে ৪৮০ বস্তা ইউরিয়া সারসহ বিপুল পরিমাণ ছোলা ও বুটের ডাল জব্দ করে কোস্ট গার্ড সদস্যরা।

 

তাছাড়া ২৪ জুলাই রাতে সীতাকুণ্ড সংলগ্ন সন্দ্বীপ চ্যানেলে অভিযান চালিয়ে একটি ফিশিং ও একটি কার্গো বোট থেকে মোট ৩৮০ বস্তা সার এবং ২৪০ বস্তা সিমেন্ট উদ্ধারসহ ১০ জন চোরাকারবারিকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যদিকে ১৩ জুলাই চট্টগ্রাম বহির্নোঙর থেকে তিনটি কার্গো বোট থেকে ২ হাজার ৪০০ বস্তা সিমেন্ট এবং ২৫০ বস্তা ডিএপি সার উদ্ধারসহ সর্বোচ্চ ২২ জন পাচারকারীকে আটক করেছিল কোস্ট গার্ড। ২ জুলাই পতেঙ্গায় একই ধরনের অভিযানে ৬০০ বস্তা সিমেন্টসহ ৫ জনকে আটক করা হয়েছিল।

 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তাদের মতে, পাশের দেশ মিয়ানমার ও ভারতে অভ্যন্তরীণভাবে সারের বাজারদর বাংলাদেশের চেয়ে বহুগুণ বেশি হওয়ায় এই অবৈধ বাণিজ্যে অতিরিক্ত মুনাফা লুটছে চোরাকারবারিরা। তদুপরি নদী, সমুদ্র ও সীমান্তপথ ব্যবহার করে সার বা পণ্য পাচার করে নিয়ে আসার সময় ফিরতি নৌযানে করে নিয়ে আসা হচ্ছে ধ্বংসাত্মক ইয়াবা ও আইস। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল বিষয়টির ভয়াবহতা নিশ্চিত করে জানান যে, জলপথের পাশাপাশি সড়ক ও স্থলপথের স্পর্শকাতর পয়েন্টগুলোতে বিজিবি, পুলিশ ও তাদের সংস্থা যৌথভাবে কঠোর পাহারা অব্যাহত রেখেছে।

 

কৃষি ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আফরুজ মুর্মা এই অপকর্ম প্রসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, সরকার বিপুল টাকা ভর্তুকি দিলেও মূল ডিলার পয়েন্ট থেকে সারগুলো ঠিক কোথায় এবং কীভাবে চোরাকারবারিদের হাতে গিয়ে পেঁছায় তা সুনির্দিষ্ট তথ্য আকারে বের হয়ে আসছে না। স্থানীয় ডিলার পয়েন্টগুলো কঠোর নজরদারিতে রাখা হলেও পাচার থামছে না। অপরদিকে টেকনাফ স্থলবন্দর পরিচালনাকারী সংস্থা ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) মো. জসিম উদ্দিন চৌধুরী সুস্পষ্টভাবে নিশ্চিত করেছেন যে, টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে চাল, আলু বা বিভিন্ন পণ্য বৈধভাবে আমদানি-রপ্তানি হলেও সার বা সিমেন্ট জাতীয় কোনো ভর্তুকিকৃত বা সংবেদনশীল পণ্য মিয়ানমারে বৈধভাবে সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে রপ্তানির কোনো সুযোগ বা অনুমোদন নেই। সম্পূর্ণ অবৈধ পথেই চলছে এই ভয়াবহ চোরাচালান।



এ সম্পর্কিত আরো খবর