আব্দুল কাইয়ুম খান, বিশেষ প্রতিনিধি
বহুদিন
ধরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান নিয়ে নানা আলোচনা ও
লেখালেখি চলছে। বিভিন্ন জরিপ ও অনুসন্ধানী
তথ্যে দেখা যায়, সেবা
প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি
বা বিআরটিএ দুর্নীতির দিক থেকে শীর্ষস্থানীয়
অবস্থানে রয়েছে। জনগণের সেবায় নিয়োজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয়
প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও এটি কেন এখনো
সংস্কারের মুখ দেখছে না—সেটিই এখন সবচেয়ে বড়
প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিআরটিএ’র সেবা যেমন
ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস ও রুট পারমিট
প্রদানসহ প্রতিটি ধাপে সাধারণ মানুষ
প্রতিনিয়ত চরম হয়রানির শিকার
হচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং চুক্তিভিত্তিক জনবলের
একটি বড় অংশ সরাসরি
অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের
সাথে জড়িত। কর্মকর্তা রদবদল বা বদলি হলেও
এখানকার মূল পদ্ধতির কোনো
পরিবর্তন হয় না, যা
মূলত অপশাসনেরই চিত্র নির্দেশ করে।
অন্যান্য সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের চিত্রও এর থেকে খুব একটা ভিন্ন নয়। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউকের দুর্নীতি নিয়ে নানামুখী তথ্যের কারণে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। কোনো সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান যদি সমালোচনা শুনতে না চায় বা জবাবদিহিতা এড়িয়ে চলে, তবে সে প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে পড়ে। ভূমি অফিস, আয়কর অফিস ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসহ বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানে ঘুষ লেনদেনের অনিয়ম সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। ঘুষ গ্রহণের ক্ষেত্রে নানা কৌশল অবলম্বন করা হয়, যেখানে অপরাধীরা বিভিন্ন উপায়ে অনৈতিক অর্থ লেনদেন করে থাকে। অনিয়মে জড়িতদের কেবল সাময়িক বরখাস্ত করে পরবর্তীতে আবার নতুন পদায়ন করার যে সংস্কৃতি চালু রয়েছে, সেই চক্র দ্রুত ভাঙতে হবে।
এই ভয়াবহ দুর্নীতির আখড়া থেকে মুক্তির জন্য অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। প্রথমত, বিআরটিএ সহ সকল সেবা প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরের কর্মকর্তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের সঠিক হিসাব গ্রহণ করতে হবে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা প্রায়ই অনৈতিক সম্পদ আড়াল করতে আত্মীয়স্বজন বা শ্বশুরবাড়ির সম্পত্তিসংক্রান্ত যে অজুহাত দেন, সেই সম্পদের প্রকৃত উৎস কড়া নজরদারির মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অভিযুক্ত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে তাদের কর্মকালে গৃহীত সমস্ত সিদ্ধান্ত পুনরায় যাচাই করতে হবে। তৃতীয়ত, দুর্নীতি দমন কমিশনকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে, যাতে যেকোনো প্রভাবশালী অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়। পাশাপাশি দুর্নীতি বিরোধী সাংবাদিক ও সচেতন সামাজিক সংগঠনগুলোকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে অনুসন্ধান ও প্রতিরোধে ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
জনগণের
করের টাকায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও সুবিধাদি
বৃদ্ধি করা হলেও সেবা
নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও অনৈতিক লেনদেনের
মুখোমুখি হতে হওয়া জাতির
জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। বিশ্বের যেসব দেশ দুর্নীতি
দমন করতে পেরেছে, তারা
আজ উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে। দেশ থেকে দুর্নীতি
নির্মূল করা না গেলে
কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না।
তাই বিআরটিএ সহ রাষ্ট্রের সকল
সেবা খাতকে অবিলম্বে দুর্নীতিমুক্ত ও সুশাসনে ফিরিয়ে
আনাই এখন সময়ের দাবি।