বিশ্বজুড়ে জলবায়ুর চরম রূপ ও অস্বাভাবিক উষ্ণতা মানবজাতির জন্য এক ভয়াবহ বিপদের ঘণ্টা বাজিয়েছে। শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বব্যাপী দেখা দেওয়া রেকর্ড দাবদাহ, তীব্র খরা ও পানির সংকটের জেরে আগামী কয়েক মাসে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস মিলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, এর প্রভাবে আগামী পাঁচ মাসে বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত সাড়ে চার লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাস থেকে শুরু করে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ পর্যন্ত এল নিনোর ভয়াবহ তাপমাত্রাজনিত কারণে বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রাণহানির সিংহভাগ ঝুঁকি বইতে হচ্ছে উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোকে। বিশেষ করে যেসব দেশ ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি এবং আন্তর্জাতিক সংকটের জেরে সৃষ্ট খাদ্য ও জ্বালানি সংকটের সঙ্গে লড়াই করছে, তাদের ওপর এর আঘাত সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে।
গবেষণার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সহ-লেখক মাইকেল গ্রিনস্টোন সতর্ক করে জানিয়েছেন, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে এল নিনোর প্রাদুর্ভাব শেষ হওয়ার কথা থাকলেও গরমের মারাত্মক ঝুঁকি এরপরও বহাল থাকতে পারে। আবহাওয়ার এই চরম পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব আগামী বছরের গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত সুদূরপ্রসারী হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, তুলনামূলক উষ্ণ ও দরিদ্র অঞ্চলগুলোতে অতিরিক্ত তাপমাত্রা মানুষের জীবনের জন্য বহু গুণ বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। পক্ষান্তরে, ধনী দেশগুলোতে আধুনিক শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহের সুযোগ থাকায় তারা তুলনামূলক সুরক্ষিত থাকে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গ্লোবাল সাউথের উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর এই দাবদাহের সবচেয়ে বড় ধকল যাবে। আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির দক্ষিণ প্রান্তের শুষ্ক সাহেল অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ৬৬ হাজার ৮০০ মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া মিলিয়ে ১৯ হাজার ৪০০ জন; ইন্দোনেশিয়ায় ১৯ হাজার ৩০০ জন; ভারতে ১৫ হাজার ৮০০ জন এবং ব্রাজিলে ১৩ হাজার ৩০০ জনের অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের আগাম প্রস্তুতি ও কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা বলেছেন গবেষকরা। এর মধ্যে রয়েছে দাবদাহের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালু করা, পর্যাপ্ত শীতলীকরণ কেন্দ্র ও বিনামূল্যে খাবার পানির বুথ স্থাপন করা, উন্মুক্ত স্থানে কর্মরত শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং হাসপাতালের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়ানো। পাশাপাশি, তাপমাত্রা চরম আকার ধারণ করার আগেই জরুরি অর্থ ছাড়ের জন্য 'পূর্বাভাসভিত্তিক অর্থায়নের' তাগিদ দিয়েছেন তারা। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রতিবেদন কেবল আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য নয়, বরং নীতি-নির্ধারকদের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার এক কঠোর তাগিদ।
প্রাকৃতিক এই জলবায়ু চক্রের সঙ্গে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব যুক্ত হয়ে চরম তাপমাত্রার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব জানিয়েছে, এল নিনোর সময়ে বিশ্বের স্থলভাগের তাপমাত্রা সাধারণ সময়ের তুলনায় প্রায় ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪৪ শতাংশ বেশি চরম তাপপ্রবাহের দিন তৈরি করবে। বর্তমানের এই উষ্ণতা ভবিষ্যৎ পৃথিবীর একটি আগাম বার্তা দিচ্ছে, যা নীতিনির্ধারকদের এখনই সঠিক পদক্ষেপ নিয়ে হাজার হাজার মানুষের জীবন রক্ষা করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
সূত্র: এপি।