নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায় মেঘনা নদীতে সংঘটিত এক মর্মান্তিক ট্রলারডুবির ঘটনার দীর্ঘ ২৩ ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও একই পরিবারের নিখোঁজ চার সদস্যের এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজ মেলেনি। নিখোঁজ ব্যক্তিদের জীবিত কিংবা মৃত উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ উদ্ধার অভিযান বর্তমানে জোরেশোরে অব্যাহত রয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার একটি আনন্দঘন পারিবারিক বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে আত্মীয়ের বাড়িতে নৌপথে যাত্রা করার সময় হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়ে ট্রলারটি মাঝ নদীতে ডুবে যায়। এই ভয়াবহ জলদুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং একই পরিবারের চারজন সদস্য নিখোঁজ হন। নিখোঁজ চারজন হলেন হেলাল উদ্দিন (৫৫), সজীব (২৪), সামিয়া (১৭) এবং ছোট্ট শিশু সামিন (৫)। তারা সবাই কুমিল্লার হোমনা উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা। সেখান থেকে ট্রলারে চড়ে তারা সোনারগাঁর বৈদ্যেরবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় চৌদ্দজন যাত্রী গবাদিপশুসহ একটি ট্রলারে আরোহণ করে সোনারগাঁর বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের হারিয়া এলাকায় সাজিয়া আক্তার ও শিশিরের বিবাহ উৎসবে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। বিকেল আনুমানিক দুইটার দিকে ট্রলারটি মেঘনা নদীর সোনাময়ী এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ আবহাওয়া মারাত্মকভাবে খারাপ হয়ে যায় এবং তীব্র ঝড়ের কবলে পড়ে মুহূর্তের মধ্যে ট্রলারটি পানিতে তলিয়ে যায়। দুর্ঘটনার সময় নদী পারাপারের কাজে নিয়োজিত কাছাকাছি থাকা আমান কোম্পানির একটি বড় ট্রলার অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে দ্রুত ঘটনাস্থলে এগিয়ে যায় এবং ৯ জন যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। তবে এই আকস্মিক দুর্যোগের কবলে পড়ে রায়েসা বেগম (৪০) নামের এক নারী পানিতে ডুবে মারা যান এবং পরবর্তীতে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ সময় পরিবারের আরও চারজন সদস্য নিখোঁজ হয়ে যান। সন্ধ্যার পর চারপাশ সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় এবং নদীতে প্রচণ্ড স্রোত ও প্রতিকূল পরিবেশ থাকায় প্রথম দিনের উদ্ধার অভিযান স্থগিত করতে বাধ্য হয় প্রশাসন।
পরবর্তীতে শুক্রবার সকাল থেকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে নতুন করে ব্যাপক ও নিবিড় তল্লাশি শুরু হয়। শুক্রবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান যে, গতকাল রাতে উদ্ধার অভিযান স্থগিত রাখার পর আজ শুক্রবার সকাল সাতটা থেকে ফায়ার সার্ভিসের বিশেষ দল আবার নদীতে অভিযান শুরু করেছে। নিখোঁজদের সন্ধানে ফায়ার সার্ভিসের তিন জন অভিজ্ঞ ডুবুরি নদীতে নেমে অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যেও তল্লাশি চালাচ্ছেন। তবে সারাদিন অভিযান চললেও শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নিখোঁজ চারজনের কারও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। প্রিয়জনদের হারিয়ে মেঘনা নদীর তীরে শোকার্ত স্বজনদের বুকফাটা আহাজারিতে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিস ও কোস্টগার্ডের কর্মীরাও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসিফ আল জিনাত সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে জানান, গত রাত থেকেই ফায়ার সার্ভিসের একটি দল এবং কোস্টগার্ডের দুটি দল ঘটনাস্থলে সার্বক্ষণিক অবস্থান করছে। নিখোঁজদের উদ্ধারে উপজেলা প্রশাসন সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। একটি আনন্দঘন বিয়েবাড়ির অনুষ্ঠান কীভাবে চোখের নিমেষে এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে রূপ নিতে পারে, মেঘনা নদীর এই দুর্ঘটনা তারই এক হৃদয়বিদারক দৃষ্টান্ত। স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী দল জানিয়েছে, নদীর তলদেশে অতিরিক্ত পলি ও তীব্র স্রোতের কারণে উদ্ধার কার্যক্রমে কিছু জটিলতা তৈরি হচ্ছে, তবুও নিখোঁজদের সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত এই তল্লাশি কার্যক্রম কোনোভাবেই বন্ধ হবে না। নিখোঁজদের হতভাগ্য পরিবার ও এলাকাবাসী এখন যেকোনো মূল્યે তাদের প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার আকুল প্রতীক্ষায় নদীপাড়ে উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে সময় কাটাচ্ছেন।