রাজধানীর মিরপুরের ঐতিহাসিক রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রাতের অন্ধকারে চালানো বর্বরোচিত ভাঙচুরের ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশক ধরে অবহেলিত ও দরিদ্র মানুষের আস্থার প্রতীক হিসেবে কাজ করে যাওয়া এই জনকল্যাণমূলক চিকিৎসালয়টি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার মাত্র একদিনের মাথায় দ্রুত সেবা চালুর যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। রোববার সন্ধ্যায় দুর্ঘটনাকবলিত ও বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়া ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রাঙ্গণ সরেজমিন পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এই দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান, আগামী সোমবার থেকেই প্রতিষ্ঠানটিতে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হবে। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে এলাকার হতদরিদ্র, প্রসূতি মা এবং সাধারণ মানুষ এই কেন্দ্রটি থেকে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা পেয়ে আসছে। তাই যেকোনো মূল্যে এই মানবিক সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হবে এবং তা কোনো অবস্থাতেই ব্যাহত হতে দেওয়া হবে না। নিজের ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে সার্বিক সহযোগিতা নিশ্চিত করে যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ সম্পন্ন করা হবে বলেও তিনি জোরালোভাবে উল্লেখ করেন।
পরিদর্শনকালে সেবামূলক এই প্রতিষ্ঠানে চালানো ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ও তাণ্ডব দেখে গভীর হতাশা, মর্মাহত ভাব ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন আমিনুল হক। রাতের গভীরে প্রায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় ধরে বুলডোজার ব্যবহার করে একটি চলমান চিকিৎসাকেন্দ্র সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ ধরনের অমানবিক ও বেআইনি কর্মকাণ্ড বর্তমান সরকার কখনোই প্রশ্রয় দেয় না উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী জানান, ইতোমধ্যে পুলিশ প্রশাসন কঠোর ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। চিকিৎসাকেন্দ্র রক্ষায় দায়িত্বে অবহেলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) তাৎক্ষণিকভাবে ক্লোজ করা হয়েছে এবং এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করতে নিবিড় তদন্ত চলছে।
একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মহলের অপপ্রচার ও দখলদারির অপচেষ্টা নিয়েও খোলামেলা কথা বলেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, কারও যদি কোনো আইনি বা সম্পত্তির দাবি বা অধিকার থাকে, তবে তা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে দেশের প্রচলিত আদালত ও আইনগত কাঠামোর ভেতর দিয়ে সমাধান করতে হবে। কিন্তু রাতের আঁধারে বুলডোজার চালিয়ে একটি জনস্বাস্থ্যকেন্দ্র মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার অধিকার পৃথিবীর কোনো আইনের দৃষ্টিতে কাউকে দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট জায়গাটি গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অধীনস্থ উল্লেখ করে তিনি এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর সঙ্গেও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন বলে জানান। এলাকার শিশুদের জীবনরক্ষাকারী টিকাদান কর্মসূচি থেকে শুরু করে প্রসূতি মা ও দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবা যাতে কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
সরকার কিংবা দল এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভাঙচুরের ঘটনায় কোনো ধরনের অস্বস্তিতে পড়েছে কি না—এমন এক প্রশ্নের জবাবে আমিনুল হক বলেন, শাহ আলী থানার ওসিকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার ও ক্লোজ করার মাধ্যমেই সরকারের নিরপেক্ষ অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। এই ন্যক্কারজনক ঘটনায় কোনো সংসদ সদস্য কিংবা দলীয় নেতাকর্মীর নাম জড়ানোর গুঞ্জন সম্পর্কে তিনি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের এবং সংবেদনশীলতার সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তে যদি দলীয় পরিচয়ের কোনো ব্যক্তির ন্যূনতম সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়, তবে তাকে কোনোমতেই ছাড় দেওয়া হবে না। আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি দলীয় ফোরাম থেকেও কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তিনি আরও জানান, এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে যেসব ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়েছেন, তারা ক্ষমতাসীন দলের কেউ নন এবং তাদের সাথে দলের কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই। তবে একটি শতভাগ স্বচ্ছ, প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নিশ্চিত করা হবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে আশ্বস্ত করেন।