রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার দক্ষিণ মানিকদীর নিরিবিলি পরিবেশে গড়ে ওঠা নিউ গিনি প্রোপার্টিজ আবাসিক প্রকল্পে ঘটে গেল এক রোমহর্ষক ও নৃশংস তাণ্ডব। গত শনিবার গভীর রাতে অতর্কিত সশস্ত্র হামলায় লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে পুরো প্রজেক্টের পাশাপাশি জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও। কোটি টাকার মূল্যবান সম্পদ ও সাজানো গুছানো স্টুডিও মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। হঠাৎ কেন এই ভয়াবহ হামলা? নেপথ্যে কি বড় কোনো চাঁদার দাবি, নাকি জমির দখল বেদখলের দীর্ঘদিনের পুরনো দ্বন্দ্ব? এই প্রশ্নই এখন সর্বমহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, শনিবার মধ্যরাতে চার থেকে পাঁচটি পিকআপ ট্রাকে করে ৬০ থেকে ৭০ জনের একটি সশস্ত্র ও মুখোশধারী দল অতর্কিতভাবে আবাসিক প্রকল্পে প্রবেশ করে। তাদের হাতে ছিল পিস্তল, রামদা, লাঠি ও চাপাতির মতো মারাত্মক অস্ত্র। প্রধান ফটকের শক্ত লোহার অংশ ভেঙে ভেতরে ঢুকে তারা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। হামলাকারীরা একে একে ভবনে ঢুকে ভাঙচুর চালায় এবং ১০ তলা ভবনের একটি ফ্ল্যাটে বসবাসরত চিকিৎসক দম্পতিকে নির্মমভাবে মারধর করে সর্বস্ব লুট করে নেয়। এ সময় পুরো এলাকায় বেশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলিও ছোড়া হয়, যার ফলে স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে রাত সাড়ে দশটার দিকে স্থানীয় এক দোকানিও মাস্ক পরা কয়েকজনকে সন্দেহজনকভাবে প্রকল্পের ভেতর প্রবেশ করতে দেখেছিলেন।
এই হামলায় সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হয়েছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওর কর্মীরা। স্টুডিওর ভেতরে থাকা উচ্চমূল্যের ক্যামেরা, তিনটি লেন্স, চারটি প্রফেশনাল লাইটিং সরঞ্জাম, সফটবক্স, সিসিটিভি সিস্টেম এবং বিলাসবহুল আসবাবপত্র সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে ও লুট করা হয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে কর্মীরা ওয়াশরুমে লুকিয়ে থেকেও রক্ষা পাননি; দুর্বৃত্তরা তাদের মোবাইল ফোন ও জমানো অর্থ ছিনিয়ে নেয়। এছাড়া প্রজেক্টের ভেতরে থাকা প্রায় ৫০ জন নির্মাণ শ্রমিকের রুমে ঢুকে তাদেরও জমানো টাকা ও ১৬টি মোবাইল ফোন লুট করা হয়। প্রজেক্টের ম্যানেজার জামাল উদ্দিন আক্ষেপ করে জানান, এশার নামাজ শেষে ঘুমাতে যাওয়ার কারণে তিনি বেঁচে গেছেন, নতুবা তাকেও প্রাণ হারাতে হতো। তার সারাজীবনের জমানো সঞ্চয় এবং নতুন বাসায় ওঠার জন্য কেনা মালামাল সব মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে গেছে।
প্রকল্পের মালিক মো. নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়া এই তাণ্ডবকে নিছক দুর্ঘটনা মানতে নারাজ। তিনি স্পষ্ট অভিযোগ করেন, চাঁদা দাবি ও জমি দখলের হীন উদ্দেশ্যে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সুপরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালিয়েছে। গত এক মাস ধরে চক্রটি বিভিন্ন সময়ে ৫০ লাখ থেকে শুরু করে ১ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করে আসছিল। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোই এই নৃশংসতার মূল কারণ। পাশাপাশি সাবেক এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে ১০ কাঠা জমি কেনা ও এর পাশের জায়গা নিয়ে বিরোধের জেরে মুখ বন্ধ করতেই এই ভয়াবহ হামলা চালানো হয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের নামও এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এদিকে খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মো. মাহিদুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক তদন্তে জমিজমা সংক্রান্ত দখল ও বিরোধের জের ধরেই এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। বিষয়টি নিয়ে গভীর তদন্ত চলছে। অন্যদিকে ক্যান্টনমেন্ট জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার নাজমুল হক জানিয়েছেন, দুই পক্ষের বিরোধের মাঝে পড়ে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে দেশীয় অস্ত্রসহ তিনজনকে আটক করা হয়েছে এবং জড়িত অন্যান্য অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।